শনিবার | সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের ৭২ শতাংশই মাদ্রাসা, ফল বিপর্যয়ে প্রশ্নের মুখে শিক্ষার মান কক্সবাজারের মাদ্রাসায় সংকটের স্তূপ, ফল বিপর্যয়ে প্রশ্নের মুখে শিক্ষার মান

শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের ৭২ শতাংশই মাদ্রাসা, ফল বিপর্যয়ে প্রশ্নের মুখে শিক্ষার মান কক্সবাজারের মাদ্রাসায় সংকটের স্তূপ, ফল বিপর্যয়ে প্রশ্নের মুখে শিক্ষার মান

রিয়াজ উদ্দিন, কক্সবাজার থেকে : চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল যেন মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরের দীর্ঘদিনের নানা সংকটকে একসঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে। সারাদেশে ৩১২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। এর মধ্যে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের প্রতিষ্ঠানই ২২৬টি—যা মোট শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭২ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ১৭৮টি।

এমন ফলাফল শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা নয়; বরং মাদ্রাসা শিক্ষার পাঠদান, শিক্ষক সংকট, অবকাঠামো, শিক্ষার্থী উপস্থিতি, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও একাডেমিক তদারকির কার্যকারিতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলেছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী ফেল করার পেছনে কেবল শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা দায়ী হতে পারে না। শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন কি না, পাঠদানের মান কেমন, শিক্ষার্থীরা নিয়মিত উপস্থিত থাকছে কি না এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় জবাবদিহি রয়েছে কি না—এসব বিষয় গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের একই সঙ্গে আরবি, কোরআন-হাদিসের পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি, গণিতসহ সাধারণ বিষয় পড়তে হয়। ফলে পর্যাপ্ত শিক্ষক ও কার্যকর পাঠদান নিশ্চিত না হলে শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

কক্সবাজারের মাদ্রাসাগুলোতেও সংকট

কক্সবাজার ইসলামিয়া মহিলা কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা শফিউল হক জিহাদী ফল বিপর্যয়ের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বিতর্কিত এক বাস্তবতার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি, আগের শিক্ষা ব্যবস্থায় মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা পাবলিক পরীক্ষায় দেখাদেখির সুযোগ পেত। কিন্তু ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় প্রতিটি কক্ষে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের কারণে সেই সুযোগ আর ছিল না। পাশাপাশি জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন পড়াশোনা থেকে দূরে থাকায় ফলাফলে তার প্রভাব পড়েছে বলেও তিনি জানান।

তবে প্রশ্ন উঠছে—একটি প্রতিষ্ঠানের ভালো ফল কি পরীক্ষার হলে অনিয়মের ওপর নির্ভর করবে? নাকি নিয়মিত পাঠদান, দক্ষ শিক্ষক, শিক্ষার্থীর প্রস্তুতি এবং কার্যকর তদারকিই হওয়া উচিত ভালো ফলের প্রধান ভিত্তি?

অভিভাবকের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন

কক্সবাজার সদরের তেতৈয়া তাফহীমুল কুরআন আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আমিন মনে করেন, ফল খারাপ হওয়ার পেছনে অভিভাবকদের দায়িত্বে অবহেলাও অন্যতম কারণ।

তিনি বলেন, অনেক অভিভাবক সন্তান বাসায় নিয়মিত পড়াশোনা করছে কি না, যথাসময়ে মাদ্রাসায় যাচ্ছে কি না কিংবা পরীক্ষায় কেমন ফল করছে—এসব বিষয়ে যথেষ্ট সজাগ নন। ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় অনিয়ম তৈরি হচ্ছে এবং এর প্রভাব পড়ছে পরীক্ষার ফলাফলে।

তবে অভিভাবকদের পাশাপাশি শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

১১ শিক্ষক পদ শূন্য, নেই পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ

তেতৈয়া তাফহীমুল কুরআন আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আমিন জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানে ১১টি শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সমস্যাও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে।

তিনি জানান, বিগত সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে মাদ্রাসাটির জন্য একটি নতুন ভবন বরাদ্দ দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে পুরোনো ও সীমিত অবকাঠামোর মধ্যেই চলছে পাঠদান।

বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টির সময় শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকে পড়ে। এতে স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হয়। পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় শিক্ষার্থীদের জন্যও তৈরি হচ্ছে অস্বস্তিকর পরিবেশ।

অধ্যক্ষের দাবি, বরাদ্দকৃত ভবন বাস্তবায়ন, ১১টি শূন্য শিক্ষক পদ পূরণ, যাতায়াতের রাস্তা সংস্কার এবং অভিভাবকদের সচেতন করা গেলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পড়াশোনার মান বাড়বে।

শুধু শিক্ষার্থীদের দায়ী করা যাবে না

কক্সবাজার আদর্শ মহিলা কামিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আমান উল্লাহ বলেন, মাদ্রাসার ফল বিপর্যয়ের দায় শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না।

তাঁর মতে, শূন্য পাস করা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কারণ পৃথকভাবে অনুসন্ধান করা দরকার। শিক্ষক উপস্থিতি, পাঠদানের মান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং একাডেমিক তদারকি—সবকিছু যাচাই করতে হবে।

আছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন মাদ্রাসায় অভ্যন্তরীণ কোন্দল, গ্রুপিং ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার অভিযোগ রয়েছে। কোথাও শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস নেন না, আবার কোথাও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও সন্তোষজনক নয়।

ফলে পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পায় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষক সংকট, শ্রেণিকক্ষের অভাব, জরাজীর্ণ ভবন, শিক্ষা উপকরণের সংকট এবং বিজ্ঞান ও পাঠাগার সুবিধার সীমাবদ্ধতা।

কঠোর মূল্যায়নে বেরিয়ে এসেছে প্রকৃত চিত্র?

এবারের ফলাফলে মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তনও আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন, খাতা মূল্যায়নে তুলনামূলক কঠোরতার কারণে এবার শিক্ষার্থীদের প্রকৃত প্রস্তুতির চিত্র সামনে এসেছে।

গত কয়েক বছর ধরে ভালো ফলাফলের যে প্রবণতা দেখা গেছে, এবার তার বিপরীতে বাস্তব চিত্র অনেকটা স্পষ্ট হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—আগের ভালো ফল কি সত্যিই শিক্ষার মানের প্রতিফলন ছিল, নাকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফলাফল ধরে রাখার অন্য সুযোগ-সুবিধার ওপর নির্ভরশীল ছিল?

এখনই ব্যবস্থা না নিলে সংকট আরও গভীর হবে

শিক্ষাবিদদের মতে, শূন্য পাস করা ৩১২টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিটির বিরুদ্ধে শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কেন একটি প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারল না—তার মূল কারণ বের করতে হবে।

দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশেষ একাডেমিক সহায়তা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, নিয়মিত ক্লাস নিশ্চিত করা এবং উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে কার্যকর মনিটরিং জোরদার করার দাবি উঠেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু পাসের হার বাড়ানো নয়, শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন নিশ্চিত করাই হতে হবে শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য।

২০২৬ সালের ফলাফল তাই মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয়। বরং এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও একাডেমিক তদারকির ঘাটতি নিয়ে একটি বড় সতর্কবার্তা। এখন দেখার বিষয়, এই সতর্কবার্তার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা কার্যকর উদ্যোগ নেয়।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা