ফাহাদ-ই-আজম, সাভার : সাভার-আশুলিয়ার মহাসড়ক থেকে শুরু করে আবাসিক এলাকার অলিগলি—সর্বত্রই বেড়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচল। নির্ধারিত স্ট্যান্ড ও রুট না মেনে যাত্রী ওঠানামা, হঠাৎ ইউটার্ন, বিপরীতমুখী চলাচল এবং রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ার ঘটনায় বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়গুলোতে অটোরিকশার জট তৈরি করছে যানজট। এতে ভোগান্তিতে পড়ছেন পথচারী, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবীসহ সাধারণ যাত্রীরা।
সাভার-আশুলিয়া মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা গেছে, সড়কের পাশে সারিবদ্ধভাবে অটোরিকশা দাঁড় করিয়ে যাত্রী তোলা হচ্ছে। কোথাও কোথাও চালকরা মাঝসড়কেই গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছেন। এতে পেছন থেকে আসা যানবাহনকে পাশ কাটিয়ে চলার সুযোগ কমে গিয়ে দ্রুতই সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। ব্যস্ত সময়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অটোরিকশাচালকদের একটি অংশ ট্রাফিক আইন ও সড়ক ব্যবহারের নিয়ম মানছেন না। মোড়, বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে হঠাৎ গাড়ি ঘুরিয়ে দেওয়া কিংবা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী নেওয়ার কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
পথচারীর অভিজ্ঞতা
সাভারের পথচারী গৃহিণী নাইমা আজম বলেন, শাশুড়ির ওষুধ কিনতে রাস্তা পার হওয়ার সময় অনেক সময় অটোরিকশাগুলো কোন দিক থেকে আসছে তা বোঝা যায় না। দ্রুতগতিতে এসে হঠাৎ সামনে ব্রেক করার ঘটনাও ঘটে। একটু অসতর্ক হলেই বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
অলিগলিতেও বাড়ছে চাপ
আশুলিয়া সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি লায়ন মোহাম্মদ ইমাম হোসেন বলেন, অলিগলিতে অটোরিকশার সংখ্যা অনেক বেড়েছে। রাস্তা সরু হওয়ায় দুটি যান পাশাপাশি চললেই পথচারীদের হাঁটার জায়গা থাকে না। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের চলাচলের সময় পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
শুধু মহাসড়ক নয়, স্থানীয় বাজার, আবাসিক এলাকা ও সংযোগ সড়কেও অটোরিকশার আধিপত্য দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ফুটপাত কিংবা সড়কের একাংশ দখল করে এসব যান দাঁড়িয়ে থাকায় পথচারীদের মূল সড়ক দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে। ফলে বাস, ট্রাক, প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলের সঙ্গে পথচারীদের সংঘর্ষের আশঙ্কা বাড়ছে।
যানজটে নাকাল কর্মজীবীরা
অগ্রণী ব্যাংকের ক্যাশিয়ার কাউসার বলেন, অফিসে যাওয়ার সময় প্রতিদিনই যানজটে পড়তে হয়। অটোরিকশাগুলো যেখানে-সেখানে থামায় সড়কের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়। কয়েক মিনিটের পথ পাড়ি দিতেও অনেক বেশি সময় লেগে যায়।
বন্ধ নয়, প্রয়োজন নিয়ন্ত্রণ
সাভার পৌরসভা মেয়র প্রার্থী লায়ন মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, অটোরিকশা চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করার চেয়ে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। এ জন্য নির্দিষ্ট রুট ও স্ট্যান্ড নির্ধারণ, চালকদের প্রশিক্ষণ, বৈধ কাগজপত্র যাচাই এবং মহাসড়কে অবৈধভাবে চলাচলকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
নীতিমালার আওতায় আনার পরামর্শ
দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির (দুপ্রক) সাভার উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন খান নঈম বলেন, শহর বা শিল্পাঞ্চলে স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে অটোরিকশা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এসব যান চলাচল করলে সড়কের সক্ষমতা কমে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। গণপরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় রেখে অটোরিকশার জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
নিয়মিত জব্দের দাবি পুলিশের
এ বিষয়ে সাভার হাইওয়ে থানার ওসি সাওগাতুলকে ফোন করা হলে তিনি ফোনে না থাকায় হাইওয়ে পুলিশ পরিদর্শক আসাদুজ্জামান নূর জানান, মহাসড়কে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫টি অটোরিকশা জব্দ করা হয়।
তিনি বলেন, মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালনা করা হলেও কিছুদিন পর আবার আগের পরিস্থিতি ফিরে আসে। চালকদের সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি ট্রাফিক আইন অমান্য করলে জরিমানাসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, মহাসড়কে নিষেধাজ্ঞা ও অভিযান থাকা সত্ত্বেও এসব অটোরিকশা কীভাবে বিভিন্ন আবাসিক এলাকা ও সড়কে অবাধে চলাচলের সুযোগ পাচ্ছে। পাশাপাশি আবাসিক এলাকায় গড়ে ওঠা অটোরিকশার গ্যারেজগুলো নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এসব গ্যারেজে বিদ্যুতের ব্যবহারসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা। সামাজিক ও নাগরিক সংগঠনগুলোও সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নিলে সমস্যাটির টেকসই সমাধান সম্ভব বলে মত স্থানীয়দের।
বাড়ছে জনচাপ, প্রয়োজন কার্যকর ব্যবস্থাপনা
সাভার-আশুলিয়ায় শিল্পকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকা দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়ায় প্রতিদিনই সড়কে মানুষের চাপ বাড়ছে। এর সঙ্গে নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশা চলাচল অব্যাহত থাকলে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
তাদের মতে, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত নজরদারি, নির্দিষ্ট রুট ও স্ট্যান্ড ব্যবস্থাপনা, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন জরুরি। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে সাভার-আশুলিয়ার সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকিও অনেকটা কমানো সম্ভব।
