বৃহস্পতিবার | সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশবরিশাল ‎কুয়াকাটা পল্লী বিদ্যুতে ‘ভৌতিক বিলে’ দিশেহারা গ্রাহকরা

‎কুয়াকাটা পল্লী বিদ্যুতে ‘ভৌতিক বিলে’ দিশেহারা গ্রাহকরা

‎কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি: ‎কুয়াকাটা পল্লী বিদ্যুতের গ্রহকদের বিল সংক্রান্ত ভোগান্তি চরমে। পরিশোধিত বিল পুনঃ সংযোজন, মিটারের রিডিং না দেখে অনুমান নির্ভর বিল তৈরি, সময় মতো বিলের কাগজ না পাওয়াসহ বিল সংশোধনের জন্য বিদ্যুৎ অফিসে দৌড়ঝাপ, এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে ঘোড়াঘুড়িসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে কুয়াকাটা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের বিরুদ্ধে। ‎

‎স্থানীয় গ্রাহকদের ভাষ্য, জুলাই মাসের বিল নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করার পরও আগস্ট মাসের বিলে অনেকের আগের মাসের পরিশোধিত বিল পুনরায় যুক্ত হয়েছে। এতে কোনো কোনো গ্রাহকের বিল স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি হয়েছে। বিলের কাগজ হাতে পাওয়ার পর বিষয়টি নজরে এলে অফিসে যোগাযোগ করে তারা সমস্যার কথা জানতে পারেন।

‎মৎস্যবন্দর আলীপুরের ব্যবসায়ী মো. আবুল কালামের মিটার নম্বর ৫০০১৫৮০০৬। আগস্ট মাসে তাঁর বিদ্যুৎ বিল এসেছে ২ হাজার ৭৮৬ টাকা। তাঁর দাবি, যাচাই শেষে প্রকৃত বিল হওয়ার কথা ১ হাজার ৩৬১ টাকা। একইভাবে গ্রাহক মিজানুর রহমানের মিটার নম্বর ০০২৫০৬৭৫। তাঁর আগস্ট মাসের বিল এসেছে ১ হাজার ৬৪০ টাকা। অথচ সংশোধিত হিসাবে বিল হওয়ার কথা ১ হাজার ২০৬ টাকা।

‎গ্রাহকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ বিল সংক্রান্ত এসব জটিলতায় কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়ার পরিবর্তে উল্টো হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে তাদের। অনেকেই ভুল বুঝতে না পেরে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করেছেন। পরে বিষয়টি জানতে পেরে অতিরিক্ত অর্থ সমন্বয় কিংবা বিল সংশোধনের জন্য একাধিকবার অফিসে যেতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

‎এ ছাড়া জুয়েল ফরাজী, রহিম ফরাজী, মজিদ ফরাজীসহ শত শত গ্রাহকের বিলেও অতিরিক্ত অর্থ যুক্ত হওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

‎পাঁচ মিটারেই বিলের অসঙ্গতি
‎মৎস্যবন্দর আলীপুরের মেসার্স সুফিয়া মেডিকেল হলের স্বত্বাধিকারী হাজী মো. মহিবুল্লাহ জানান, তাঁর দোকান, বাসা ও অফিসসহ মোট পাঁচটি বিদ্যুৎ মিটার রয়েছে। আগস্ট মাসে প্রতিটি মিটারেই স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বিল আসে। চারটি মিটারের বিল পরিশোধ করার পর পঞ্চম মিটারের বিল দিতে গিয়ে অস্বাভাবিক অঙ্ক দেখতে পান তিনি।

‎মহিবুল্লাহ বলেন, বিলের কাগজ যাচাই করে দেখা যায়, জুলাই মাসের বিল আগেই পরিশোধ করা হলেও ওই বিলের অর্থ আগস্ট মাসের বিলের সঙ্গে আবারও যুক্ত করা হয়েছে। পরে বিষয়টি নিয়ে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করলে তাঁকে অফিসে এসে বিল সংশোধনের পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে অফিসে যাওয়ার পর বিল সংশোধন করে কমিয়ে দেওয়া হয়।

‎তাঁর দাবি, যেসব মিটারে অতিরিক্ত বা দ্বিগুণ বিল ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে, সেই অর্থ সরাসরি ফেরত না দিয়ে পরবর্তী মাসের বিলের সঙ্গে সমন্বয় করার কথা অফিস থেকে জানানো হয়েছে।

‎তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, “ভুল যদি অফিসের কারণে হয়ে থাকে, তাহলে গ্রাহকের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হলো কেন? টাকা ফেরত না দিয়ে পরবর্তী মাসে সমন্বয়ের কথা বলা হচ্ছে কেন? নিজের টাকা সমন্বয় করিয়ে নিতে একজন গ্রাহককে আবার অফিসে আসতে হবে—এটা কেমন গ্রাহকসেবা?”

‎পরবর্তীতে প্রকৃত মিটার রিডিংয়ের সঙ্গে বিলের হিসাবের পার্থক্য ধরা পড়লে বিষয়টি গ্রাহকদেরই অফিসে গিয়ে জানাতে হয়। গ্রাহকদের মতে, নিয়মিত ও সঠিকভাবে মিটার রিডিং সংগ্রহ এবং যাচাই করা হলে এ ধরনের বিলিং জটিলতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

‎বিল পৌঁছাতে দেরি, গুনতে হয়েছে বিলম্ব মাশুল
‎এদিকে আগস্ট মাসের বিদ্যুৎ বিল গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানো নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। ভুক্তভোগীদের দাবি, অনেক গ্রাহক নির্ধারিত সময়ের শেষ দিনে, অর্থাৎ ৩০ আগস্ট বিলের কাগজ হাতে পেয়েছেন। ফলে পরদিন বিল পরিশোধ করতে গিয়ে কাউকে কাউকে বিলম্ব মাশুল দিতে হয়েছে।

‎গ্রাহকদের প্রশ্ন, বিল যদি সময়সীমার শেষ দিনে হাতে পৌঁছে, তাহলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তারা বিল পরিশোধের সুযোগ পাবেন কীভাবে? বিল প্রস্তুত কিংবা বিতরণে কোনো ধরনের বিলম্ব হলে তার দায়ভার গ্রাহকদের বহন করতে হবে কেন?

‎এ নিয়ে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কয়েকজন গ্রাহকের বাকবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

‎বিল সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে অফিসে গেলে গ্রাহকদের একাধিক টেবিলে ঘোরানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, একজন কর্মকর্তা অন্য কর্মকর্তার কাছে পাঠান, আবার অন্য টেবিল থেকে আরেক টেবিলে যেতে বলা হয়। এতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত সমাধান পাওয়া যায় না।

‎গ্রাহকদের অভিযোগ, শেষ পর্যন্ত অনেককে উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মোস্তফা আমিনুর রাশেদের কাছেও যেতে হয়। তবে সেখানেও অভিযোগের তাৎক্ষণিক ও কার্যকর সমাধান না পাওয়ার দাবি করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।

‎বিল দেরিতে পৌঁছানোর বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বিল বিতরণে দেরি করে থাকলে তাঁর কাছ থেকে টাকা আদায়ের কথা বলা হয়েছে বলেও কয়েকজন গ্রাহক অভিযোগ করেছেন। এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রাহকদের প্রশ্ন, বিল বিতরণে দেরি করা ব্যক্তিকে শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব কি গ্রাহকের? গ্রাহককেই যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে হয়, তাহলে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব কোথায়?

‎নতুন সংযোগ ও মিটার নিয়েও অভিযোগ
‎নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ ও মিটার স্থাপন নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের ডিজিএমের যোগসাজশে একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। নতুন মিটার বা সংযোগ পাওয়ার জন্য কেউ সরাসরি, আবার কেউ ওই চক্রের মাধ্যমে অর্থ দেওয়ার পরও নির্ধারিত সময়ে সংযোগ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।

‎এসব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার দাবি করেন স্থানীয়রা।
‎গ্রাহকদের মতে, বিদ্যুৎ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য সেবা। তাই বিল প্রস্তুত, মিটার রিডিং সংগ্রহ, বিল বিতরণ, ভুল বিল সংশোধন এবং নতুন সংযোগ দেওয়ার প্রতিটি পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

‎ভুল বা অতিরিক্ত বিলের ক্ষেত্রে গ্রাহককে দিনের পর দিন অফিসে ঘোরানোর পরিবর্তে দ্রুত সমস্যার সমাধান এবং অতিরিক্ত আদায় করা অর্থ দ্রুত ফেরত দেওয়া অথবা গ্রাহকের সম্মতিতে পরবর্তী বিলের সঙ্গে সমন্বয়ের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

‎সচেতন নাগরিকদের মতে, কুয়াকাটা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে পৃথক ‘গ্রাহক অভিযোগ ও নিষ্পত্তি ডেস্ক’ চালু করা হলে ভোগান্তি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। অভিযোগ গ্রহণের পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকলে গ্রাহকদের এক কর্মকর্তা থেকে অন্য কর্মকর্তার কাছে ছুটতে হবে না।

‎কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
‎এসব অভিযোগের বিষয়ে কুয়াকাটা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মোস্তফা আমিনুর রাশেদ বলেন, “সফটওয়্যারের সমস্যার কারণে বিদ্যুৎ বিল বেশি হয়েছে। এটা ঠিক হয়ে যাবে।”

‎অতিরিক্ত বিল বা অন্যান্য অনিয়মের বিষয়ে তিনি বলেন, “যদি কেউ কোনো অনিয়ম করে থাকে, সেটা গ্রাহক বুঝে নেবেন।”

‎তবে গ্রাহকদের অভিযোগ, শুধু সফটওয় ত্রুটির কথা জানালেই সমস্যার সমাধান হয় না। ভুল বিল শনাক্ত ও সংশোধনের পাশাপাশি অতিরিক্ত আদায় করা অর্থের যথাযথ নিষ্পত্তি এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের সমস্যা যাতে না হয়, সে জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

‎স্থানীয় গ্রাহকদের প্রত্যাশা, এসব অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে বিলিং জটিলতার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে পরিশোধিত বিল পুনরায় যুক্ত হওয়া, ভুল মিটার রিডিং কিংবা ‘ভৌতিক বিল’-এর মতো সমস্যার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা