স্টাফ রিপোর্টার : ‘অডিট আপত্তি মানেই দুর্নীতি নয়’—এমন মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটির নেতারা। তারা বলেছেন, কোনো অডিট আপত্তি উত্থাপিত হলে তার জবাবদিহি, নথি যাচাই ও প্রয়োজনীয় তদন্ত অবশ্যই হতে হবে। তবে আপত্তি নিষ্পত্তির আগে সেটিকে দুর্নীতির চূড়ান্ত রায় হিসেবে উপস্থাপন করা হলে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটির উদ্যোগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটির সভাপতি মনিরুজ্জামান মনির।
উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ রেলওয়ে কারিগরি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এস কে বারি, বাংলাদেশ ফ্রি ট্রেড ইউনিয়নের টিএফটিসি আনারুল হক হনি, বাংলাদেশ রেলওয়ে কারিগরি পরিষদের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক মাহাবুবুর রহমান, সহসাধারণ সম্পাদক মো. শাহাজাহান সরকার এবং বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের এস কে খোদা তোতন।
বক্তারা বলেন, ‘আমরা কোনো ব্যক্তির অন্ধ সমর্থনে দাঁড়াইনি। আমরা দাঁড়িয়েছি বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জনস্বার্থের পক্ষে।’
তারা বলেন, অভিযোগ, অডিট আপত্তি এবং প্রমাণিত অপরাধ—তিনটি এক বিষয় নয়। অডিট আপত্তি উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জবাব চাওয়া, নথি যাচাই, প্রয়োজন হলে তদন্ত এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু তদন্ত বা নিষ্পত্তির আগেই কোনো অডিট আপত্তিকে ‘দুর্নীতি’ হিসেবে চূড়ান্তভাবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের প্রসঙ্গ তুলে বক্তারা বলেন, বিভিন্নভাবে প্রকল্পটিতে প্রায় ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের দাবি সামনে এসেছে। তবে এ হিসাবের ভিত্তি জনগণের সামনে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
তাদের প্রশ্ন, চুক্তিমূল্য, সংশোধিত প্রকল্প ব্যয় এবং প্রকৃত ব্যয়ের পার্থক্যকে সরাসরি ‘অতিরিক্ত ব্যয়’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলে তা বিভ্রান্তিকর হতে পারে কি না, তা নথির ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে আবেগের পরিবর্তে প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয়, সংশোধিত ব্যয়, প্রকৃত ব্যয়, চুক্তি, কাজের পরিমাণ, গুণগত মান, বিল ভেটিং এবং অর্থ ছাড়ের নথি পর্যালোচনার আহ্বান জানান তারা।
বক্তারা আরও বলেন, একটি বড় রাষ্ট্রীয় প্রকল্প কখনো একজন ব্যক্তি একা পরিচালনা করেন না। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের বিভিন্ন সময়ে এস কে চক্রবর্তী, সুকুমার ভৌমিক, গোলাম ফখরুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, মো. আফজাল হোসেন এবং বর্তমানে নাজনীন আরা কেয়া প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
এ কারণে প্রকল্পের কোনো সিদ্ধান্ত বা অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সময়ে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের ভূমিকা পৃথকভাবে যাচাইয়ের আহ্বান জানান তারা।
তাদের মতে, কে কাজের পরিমাণ যাচাই করেছেন, কে গুণগত মান প্রত্যয়ন করেছেন, কে বিল ভেটিং করেছেন, কে অনুমোদন দিয়েছেন এবং কোন নথির ভিত্তিতে অর্থ ছাড় হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের মাধ্যমে বের করা প্রয়োজন। শুধু একজন কর্মকর্তাকে সামনে রেখে পুরো প্রকল্পের দায় নির্ধারণ করা সঠিক হবে না।
বর্তমান মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনের প্রসঙ্গে বক্তারা বলেন, তিনি আইনের ঊর্ধ্বে নন। তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তদন্ত হওয়া উচিত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে শুধু অডিট আপত্তি, অভিযোগ বা সংবাদ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তদন্ত ও নিষ্পত্তির আগেই কাউকে অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সমীচীন নয়।
বক্তারা বলেন, কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ভুল হলে তা যাচাই করা হোক এবং ভুল প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তবে প্রশাসনিক মতবিরোধ, স্বার্থের সংঘাত বা সিদ্ধান্তগত বিরোধ যেন ব্যক্তিগত আক্রমণ বা চরিত্রহননের কারণ না হয়।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে তারা বলেন, ‘আমরা কোনো সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করার দাবি করছি না। বরং আমরা চাই আরও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হোক।’ একটি অডিট আপত্তি কেন হয়েছে, তার জবাব কী দেওয়া হয়েছে, কতগুলো আপত্তি নিষ্পত্তি হয়েছে, কতগুলো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে এবং কোন কর্মকর্তার সময়ে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে—এসব বিষয় নথির ভিত্তিতে অনুসন্ধানের আহ্বান জানান তারা।
বক্তারা আরও বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ে কোনো ব্যক্তি, কর্মকর্তা, ঠিকাদার, সিন্ডিকেট বা স্বার্থগোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়; এটি জনগণের সম্পদ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। তাই ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা তাদের অবস্থান তুলে ধরে বলেন, ‘অপপ্রচার নয়—প্রমাণ চাই। অভিযোগ নয়—তদন্ত চাই। দুর্নীতি হলে শাস্তি চাই। আর নির্দোষ হলে ন্যায়বিচার চাই।’
তারা বাংলাদেশ রেলওয়েকে আরও শক্তিশালী, নিরাপদ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
