জাহাঙ্গীর আলম রাজু, আশুলিয়া প্রতিনিধি : আশুলিয়ার জামগড়ায় তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে স্বামী-স্ত্রী ও তাদের গর্ভের সন্তানের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) বলছে, নিহত নাজমা খাতুনের সঙ্গে গ্রেপ্তার মনিরুজ্জামান ওরফে হৃদয়ের (৪৪) দীর্ঘদিনের প্রেম ও শারীরিক সম্পর্কের সূত্র ধরে বিরোধের সৃষ্টি হয়। সেই বিরোধের জেরেই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
ঘটনার তিন দিনের মধ্যে মনিরুজ্জামান হৃদয়কে গ্রেপ্তার করেছে পিবিআই। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিহত নাজমার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, সিম, অফিসের পরিচয়পত্র ও হ্যান্ড পার্স উদ্ধার করা হয়েছে। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) গ্রেপ্তার আসামি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।
পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। মামলাটির তদন্ত করছেন পিবিআই ঢাকা জেলার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ আনিসুর রহমান। পিবিআই সূত্রে জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর থেকেই ঘটনাটির ছায়া তদন্ত শুরু করে সংস্থাটি। মামলাটি পিবিআইয়ের তফসিলভুক্ত হওয়ায় গত ৮ সেপ্টেম্বর স্ব-উদ্যোগে তদন্তভার গ্রহণ করা হয়। এরপর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে মনিরুজ্জামান হৃদয়কে গ্রেপ্তার করা হয়।
গত ৫ সেপ্টেম্বর রাতে আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় হযরত আলীর বাড়ির দ্বিতীয় তলার ৫৬ নম্বর কক্ষ থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি টের পেয়ে স্থানীয়রা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর দেন। পরে আশুলিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তালাবদ্ধ কক্ষের দরজা খুলে ভেতর থেকে তিনটি অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে। নিহতরা হলেন-দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানার নিশা কাজলদীঘি এলাকার আলমগীর কবির (৪৫), তার স্ত্রী নাজমা খাতুন (৩৯) এবং নাজমার গর্ভে থাকা সন্তান।
পুলিশ মরদেহগুলোর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠায়। এ ঘটনায় নিহত নাজমার বড় বোন মোছা. শাপলা বেগম বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। পিবিআই জানায়, তদন্তের একপর্যায়ে নিহতদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, চলাফেরা ও পারিবারিক বিরোধসহ বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখা হয়। এতে নাজমা খাতুনের সঙ্গে মনিরুজ্জামান হৃদয়ের দীর্ঘদিনের পূর্বপরিচয় ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের তথ্য পাওয়া যায়। পরে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ৮ সেপ্টেম্বর নরসিংহপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে হৃদয়কে গ্রেপ্তার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন বলে জানিয়েছে পিবিআই। পরে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন তিনি। পিবিআইয়ের তদন্ত ও আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে জানা যায়, নাজমার সঙ্গে হৃদয়ের দীর্ঘদিনের প্রেম ও শারীরিক সম্পর্ক ছিল। বিষয়টি নাজমার স্বামী আলমগীর জানতে পারলে হৃদয়ের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়। আসামির জবানবন্দির বরাত দিয়ে পিবিআই জানায়, ঘটনার দিন নাজমা ও আলমগীর হৃদয়কে তাদের বাসায় নিয়ে আসেন। সেখানে পুরোনো সম্পর্কের বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়।
একপর্যায়ে আলমগীর হৃদয়ের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি ও মারধরে জড়িয়ে পড়েন। নাজমাও ঝাড়ু দিয়ে হৃদয়কে আঘাত করেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে।
পরে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে হৃদয় নাজমার পেটে লাথি মারেন। এতে নাজমা ও তার গর্ভের সন্তানের মৃত্যু হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন তিনি।
নাজমার মৃত্যুর পর আলমগীর খুন্তি ও পাইপ দিয়ে হৃদয়কে আঘাত করেন। এ সময় দুজনের মধ্যে ফের ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে হৃদয় আলমগীরের মাথা ও শরীরে কয়েকটি ঘুষি মারেন। এতে আলমগীর দুর্বল হয়ে পড়লে তার গলায় গামছা পেঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করার কথা স্বীকার করেছেন হৃদয়।
এরপর তিনটি মরদেহ খাটের ওপর রেখে কক্ষটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে চলে যান তিনি। পালিয়ে যাওয়ার সময় নাজমার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, সিম, অফিসের পরিচয়পত্র ও হ্যান্ড পার্স সঙ্গে নিয়ে যান বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে ওই সামগ্রীর কিছু অংশ হৃদয়ের ভাড়া বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়। আগেও হত্যা মামলা ছিল হৃদয়ের বিরুদ্ধে
পিবিআই জানিয়েছে, গ্রেপ্তার মনিরুজ্জামান হৃদয়ের গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দা এলাকায়। তার বিরুদ্ধে এর আগে ২০২২ সালে আশুলিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছিল। ওই মামলায় ২০২৩ সালে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে পিবিআই। পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ বলেন, ঘটনার খবর পাওয়ার পর থেকেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে ছায়া তদন্ত চালানো হচ্ছিল। পরবর্তী সময়ে মামলাটি পিবিআইয়ের তফসিলভুক্ত হওয়ায় স্ব-উদ্যোগে তদন্তভার গ্রহণ করা হয়।
তিনি বলেন, গোয়েন্দা তথ্য ও বিভিন্ন আলামতের ভিত্তিতে মনিরুজ্জামান হৃদয়কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী নিহত নারীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, সিম, অফিসের পরিচয়পত্র ও হ্যান্ড পার্স উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
পিবিআইয়ের এই কর্মকর্তা আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কোনো ব্যক্তি জড়িত আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
