লামা (বান্দরবান) থেকে শাহাব উদ্দিন : বান্দরবান জেলার লামা প্রেসক্লাব দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে নতুন কোনো সদস্য অন্তর্ভুক্ত করছে না বলে অভিযোগ করেছে লামার কর্মরত সংবাদ কর্মিরা।
এর ফলে স্থানীয় তরুণ ও উদীয়মান সাংবাদিকরা পেশাগত স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, একের পর এক ৭টি বিকল্প সাংবাদিক সংগঠন সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে পেশাগত অস্থিরতা।
অপরদিকে লামা প্রেসক্লাবের কার্যকরি কমিটির স্বৈরাচারী মনোভাবের কারনে লামায় প্রতিনয়ত অপ-সাংবাদিকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে,
২০০৮ সালের পর থেকে লামা প্রেসক্লাবে নতুন কোনো সদস্যের অন্তর্ভুক্তি ঘটেনি তবে বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে প্রেসক্লাবের ক্ষমতা আরো কুক্ষিগত করার জন্য তারা আওয়ামীলীগের দলীয়পদধারী তিন জনকে লামা প্রেসক্লাবের সহযোগী সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন,এর পরে লামা প্রেসক্লাবকে সম্পূর্ণরুপে ফ্যাসিবাদের আতুড়ঘরে রুপান্তরের অংশহিসেবে তৎকালীন লামা উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক জহিরুল ইসলাম ও লামা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রদীপ কান্তি দাশকে লামা প্রেস ক্লাবে অন্তর্ভুক্ত করে, প্রকৃত সংবাদমাধ্যম কর্মিদেরকে প্রেসক্লাবের সদস্যপদ লাভের রাস্তা চিরতরে বন্ধ করে দেয়।
অথচ গত ২০ বছরে লামা উপজেলায় সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হয়েছেন বেশ কিছু উচ্চশিক্ষিত উদ্যমী ও মেধাবী তরুণ। জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করলেও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি না থাকায়, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁরা নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
লামা প্রেসক্লাব ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৯৯১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যান ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মাহমুদুল হাসান পিএস অর্থ বরাদ্দ দিয়ে ‘লামা-আলীকদম প্রেসক্লাব’ নামকরণে মৈত্রী কার্যক্রমের আওতায় সাংবাদিকদের মেলবন্ধন তৈরি করে দেন। ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি প্রেসক্লাব ভবন উদ্বোধন করেন।
এর চার মাস আগে ১৯৯১ সালের ১৪ মে বান্দরবান রিজিয়ন ৬৯ পদাতিক ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম শাখাওয়াত হোসেন এনডিসি পিএসসি ‘লামা-আলীকদম’ প্রেসক্লাবের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯৯৮ সালে আলীকদম উপজেলায় ‘আলীকদম প্রেসক্লাব’ প্রতিষ্ঠা লাভ করলে, লামা উপজেলায় প্রতিষ্ঠিত ‘লামা-আলীকদম’ প্রেসক্লাবের নতুন নামকরণ হয় ‘লামা প্রেসক্লাব।’
লামা প্রেসক্লাবে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত না করায় একের পর এক গড়ে উঠেছে নতুন নতুন সাংবাদিক সংগঠন। ফলে বর্তমানে লামায় প্রেসক্লাবের মতো সাংবাদিক সংগঠন আছে ৭টি। ১৯৯৬ সালে লামা রিপোর্টার্স ক্লাব, ২০১৩ সালে লামা সাংবাদিক ফোরাম, ২০১৪ সালে লামা সাংবাদিক ইউনিটি, ২০১৯ সালে মফস্বল সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং সর্বশেষ চলতি মাসের ১২ তারিখে গঠিত হয় হিল গ্যাজুয়েট প্রেসক্লাব।
স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের অভিযোগ, একটি নির্দিষ্ট চক্র বা কমিটির দীর্ঘমেয়াদি আধিপত্য এবং নিয়মনীতির বেড়াজালে আটকে রয়েছে প্রেসক্লাবের সদস্যপদ নবায়ন ও সম্প্রসারণ প্রক্রিয়া। এর ফলে পেশাদার সাংবাদিকতার বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে এবং নতুন প্রজন্মকে কোণঠাসা করে রাখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী প্রবীণ সাংবাদিক মোহাম্মদ করিম বলেন, “লামা প্রেসক্লাব যেখানে সকল সাংবাদিকদের মুক্তমঞ্চ হওয়ার কথা, সেখানে দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে এটি আজ যেন একটি বিশেষ গোষ্ঠীর ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে।”
স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী নজরুল ইসলাম বলেন, “একটি প্রাচীন প্রেসক্লাব নতুন মুখ গ্রহণ না করায় আমরা তরুণরা চরম হতাশার মধ্যে আছি। নতুন কাউকে সহ্য করতে পারে না লামা প্রেসক্লাবের সদস্যরা। আমাদের বলে অন্য আরও সংগঠন আছে, সেখানে গিয়ে জায়গা নিতে।”
নাম প্রকাশ না করা শর্তে লামার একাধিক সংবাদকর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা ও শিক্ষার হার বিবেচনায় লামা প্রেসক্লাবের কার্যকরি কমিটির সংখ্যা হতে হবে কমপক্ষে ৫০ জন এবং সেই সাথে লামার সকল সংবাদকর্মীদের প্রেসক্লাবে অবাধে যাতায়াতের সুযোগ থাকতে হবে কিন্তু তারা তা না করে ১২ জন মিলে লামা প্রেসক্লাবকে নিজেদের পৈত্রিক সম্পত্তির মত কুক্ষিগত করে রেখেছে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের লামা উপজেলার সদস্য এবং লামা প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারন সম্পাদক মোঃ কামরুজ্জামান বলেন, “দেড় যুগেও আমরা কোনো যোগ্য সংবাদকর্মী লামায় খুঁজে পাইনি। তাই কাউকে প্রেসক্লাবের সদস্য করা হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “প্রেসক্লাবের দায়িত্বশীল সদস্যরা গোপনে বা প্রকাশ্যে অভিজ্ঞ সংবাদকর্মীদের বিশেষ নজরদারিতে রাখার পর সদস্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সদস্য হতে ইচ্ছুক অভিজ্ঞ সংবাদকর্মীকে প্রাথমিকভাবে সহযোগী সদস্যপদ প্রদানের সুপারিশ করা হয়।”
লামা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি প্রিয়দর্শী বড়ুয়া জানান, “আমি সবসময় নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে। তবে লামা প্রেসক্লাবের অধিকাংশ সদস্য নতুন কাউকে স্থান করে দেওয়ার পক্ষে নয়। তাই নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি দেড় দশকেও। এটি আমাদের ব্যর্থতা।”এদিকে সচেতন মহল মনে করছে, সংবাদকর্মীদের মধ্যে পেশাগত ঐক্য ও মানোন্নয়নের জন্য প্রেসক্লাবের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত করা জরুরি। দ্রুত সময়ের মধ্যে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করে লামা প্রেসক্লাবকে গতিশীল করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
