শাহাব উদ্দিন আহমদ, শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধিঃ মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে রাতে বাসায় ফেরার পথে অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও লেখক মো. এহসানুল হক (এহসান বিন মুজাহির) আগ্নেয়াস্ত্রসহ এক মোটরসাইকেল আরোহীর অনুসরণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা চেয়ে শ্রীমঙ্গল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার আবেদন করেছেন তিনি। পুলিশ জানিয়েছে, আবেদনটি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাত ৮টায় শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের জরুরি সভা আহ্বান করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকের অভিযোগ, শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাত আনুমানিক ১১টা ২৫ মিনিটে তিনি মোটরসাইকেলে শহরের কালিঘাট রোড থেকে মুসলিমবাগ এলাকায় নিজের বাসার উদ্দেশে রওনা হন। মুসলিমবাগের সড়কে প্রবেশের পর একটি ইয়ামাহা মোটরসাইকেলে থাকা অজ্ঞাতপরিচয় এক যুবক তাঁকে অনুসরণ করতে থাকেন। মোটরসাইকেলটির সম্ভাব্য নিবন্ধন নম্বর ঢাকা মেট্রো-ল-১২৮৩ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
এহসানের ভাষ্য, তিনি মোটরসাইকেলের গতি বাড়ালে বা কমালে পেছনের আরোহীও একইভাবে গতি বাড়াচ্ছিলেন ও কমাচ্ছিলেন। একই সময়ে সামনে থাকা একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বসা অজ্ঞাতপরিচয় তিন যুবক তাঁকে লক্ষ্য করছিলেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এহসান জানান, অভিযুক্ত মোটরসাইকেল আরোহীর পরনে ছিল থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট ও নেভি ব্লু রঙের টি-শার্ট, দুই পায়ে ছিল হাফ মোজা। পরিস্থিতি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তিনি মুসলিমবাগ এলাকায় লন্ডনপ্রবাসী তুহিন চৌধুরীর ভবনের সামনে থেমে যান। এ সময় তাঁর প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক মাহমুদুল হাসান নাঈম ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন; তাঁকে বিষয়টি জানান এহসান।
তাঁর অভিযোগ, মোটরসাইকেল আরোহী তখন ইঞ্জিন বন্ধ করে কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ভঙ্গিতে তাঁদের ওপর নজর রাখছিলেন। বিপদের আশঙ্কায় তিনি মোটরসাইকেলের হেডলাইট বন্ধ করে একটি অন্ধকার গলি দিয়ে বাসায় পৌঁছান।
প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষক মাহমুদুল হাসান নাঈমের দাবি, অজ্ঞাতপরিচয় ওই যুবকের কোমরের বাঁ পাশে বেল্টের সঙ্গে একটি পিস্তল গোঁজা ছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই যুবক সাংবাদিক এহসানকেই অনুসরণ করছিলেন।
শ্রীমঙ্গল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সরকার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “জিডির আবেদনটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদারকি করছে। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে ওই সশস্ত্র যুবককে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের টিম কাজ করছে।”
সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান। ঘটনাটিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, দ্রুত ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য থানার ওসির সঙ্গে ইতোমধ্যে কথা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সহকারী পুলিশ সুপারের (এএসপি) সঙ্গেও আলোচনা করা হবে।
এহসান বিন মুজাহির দীর্ঘদিন ধরে মাদক, অনিয়ম ও দুর্নীতিবিরোধী বিভিন্ন বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ করে আসছেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে এর আগেও তিনি একাধিকবার হুমকি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৫ আগস্ট মাদকবিরোধী সংবাদ প্রকাশের জেরে তাঁর বাসভবনের প্রধান ফটক বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। এ ঘটনায় শ্রীমঙ্গল থানায় একটি জিডি করা হয়, যার নম্বর ১৩৫৩। ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর উপজেলার কালিঘাট চা-বাগান এলাকায় পেশাগত কাজে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে তাঁকে অনুসরণ করে হামলার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি; সে ঘটনায় দায়ের করা জিডির নম্বর ১৫২৯। এ ছাড়া ২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘নো ক্যাপশন’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে তাঁকে হত্যার পর লাশ গুম করার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় করা জিডির নম্বর ১২৮০।
আগের এসব ঘটনায় পৃথক জিডি করা হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন এহসান। এ কারণেই একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহলের কেউ কেউ। তবে আগের ঘটনাগুলোর তদন্ত ও আইনগত অগ্রগতির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক সৈয়দ সালাউদ্দিন বলেন, “পেশাদার ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকের ওপর এভাবে নজরদারি চরম উদ্বেগের বিষয় এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি আঘাত। পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও কঠোর কর্মসূচি নির্ধারণের জন্য আজ রাতেই প্রেসক্লাবের জরুরি সভা আহ্বান করা হয়েছে।”
সাংবাদিক এহসান বিন মুজাহির ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযুক্ত যুবককে দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী ও সচেতন মহল। ঘটনার নেপথ্যে অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাঁদেরও আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে তাঁরা বলেছেন, অন্যথায় কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি দেওয়া হবে।
