// অ্যাডভোকেট শফিকুল হক //
দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা আমাদের সবার প্রত্যাশা। একটি দেশের উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন সাধারণ মানুষ হয়রানি ছাড়াই সরকারি সেবা পায়, রাষ্ট্রীয় সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয় এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ ও অঙ্গীকারের কথা বলা হয়েছে। তবু দুর্নীতি কমানো এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী অগ্রগতি প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্তরিক, সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের আমরা কতটা কাজে লাগাতে পারছি? একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সর্বস্তরে সততা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারছি কি?
আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রশাসনে সবাই অসৎ নন। বহু কর্মকর্তা রয়েছেন, যাঁরা ব্যক্তিগত সততা, পেশাগত নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজ করেন। তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন করা এবং তাঁদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে কাজে লাগানো রাষ্ট্রের স্বার্থেই জরুরি। তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে শুধু সৎ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের আচরণ, প্রশাসনিক স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি সরাসরি সম্পর্কিত।
১. রাজনৈতিক নেতৃত্ব সৎ না হলে সৎ কর্মকর্তারাও অসহায়; বাংলাদেশের প্রশাসনে সততা ও পেশাগত নৈতিকতার প্রসঙ্গে ওয়াহিদুজ্জামানের কথা উল্লেখ করতে চাই। ভূমি জরিপ ও ভূমি রেকর্ডস-সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমি তাঁকে একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা হিসেবে মূল্যায়ন করি। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনের সম্পর্ক নিয়ে তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য আমার বিশেষভাবে মনে ধরেছে: ‘সৎ কর্মকর্তাগণ কিছুই করতে পারেন না, যদি না মন্ত্রী, এমপি, প্রধানমন্ত্রী—অর্থাৎ রাজনৈতিক মাস্টারগণ সৎ হন, সৎ চিন্তা করেন, দুর্নীতি না করেন, প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা না দেন।’ এই বক্তব্যের তাৎপর্য গভীর। একজন কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে সৎ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল হলেও তাঁর কাজের পরিবেশ যদি রাজনৈতিক চাপ, অনৈতিক হস্তক্ষেপ কিংবা দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষকতায় প্রভাবিত হয়, তাহলে তাঁর পক্ষে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এখানে রাজনৈতিক নেতৃত্ব বলতে শুধু প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী কিংবা সংসদ সদস্যদের বোঝানো হচ্ছে না। জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত সব স্তরের রাজনৈতিক নেতা ও রাজনীতিবিদ এর অন্তর্ভুক্ত। কোনো পর্যায়েই দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া, অনিয়মে জড়িত ব্যক্তিদের রক্ষা করা কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে জবাবদিহির বাইরে রাখার সুযোগ থাকা উচিত নয়। একজন সৎ কর্মকর্তা যদি কোনো অনিয়ম বন্ধ করতে উদ্যোগ নেন, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার প্রতিরোধ করেন কিংবা দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইনসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চান, তাহলে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো তাঁকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া। বিপরীতে, ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থে তাঁর কাজে বাধা সৃষ্টি করা হলে দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগ দুর্বল হয়ে পড়ে। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে তাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের সততা এবং প্রশাসনের পেশাগত স্বাধীনতা—দুটিই নিশ্চিত করতে হবে।
১. রাজনৈতিক নেতৃত্বের সর্বস্তরে সততা চাই, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে; রাজনৈতিক সততার প্রশ্নটি শুধু সরকারপ্রধান কিংবা মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাদের প্রত্যেকেরই নিজ নিজ অবস্থান থেকে নৈতিক দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন। রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জনকল্যাণ, জনসেবা এবং জনগণের অধিকার রক্ষা। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি যদি নিজের ক্ষমতা বা প্রভাব ব্যবহার করে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করেন, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার করেন কিংবা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের রক্ষা করেন, তাহলে তা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও জনআস্থার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সততার একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হলো—নিজেদের অনুসারী, ঘনিষ্ঠজন ও দলীয় সহকর্মীদের ক্ষেত্রেও তাঁরা একই আইন ও জবাবদিহির নীতি প্রয়োগ করতে প্রস্তুত কি না। দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা দলীয় পরিচয় বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে নয়, নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এমন প্রশাসনিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে কর্মকর্তারা আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। কোনো কর্মকর্তা জনস্বার্থে কাজ করতে গিয়ে অন্যায় চাপের মুখে পড়লে তাঁর অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। সততা শুধু ব্যক্তিগত গুণ নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মৌলিক নীতি। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি নিজেদের আচরণে স্বচ্ছতা, ন্যায়পরায়ণতা ও জবাবদিহির দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, তাহলে প্রশাসনেও ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে।
১. সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন: অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা; বাংলাদেশের প্রশাসনে এমন কয়েকজন কর্মকর্তার নাম বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে, যাঁদের সততা, নিষ্ঠা কিংবা জনস্বার্থে উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়টি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রশাসনিক সংস্কারের কার্যকর পথ খুঁজে দেখা যেতে পারে। মাহবুব আলম মিলনের অভিজ্ঞতা এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। রেলওয়ের দুর্নীতি দূর করার বিষয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছিলেন, তাঁকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হলে তিন মাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারবেন। আগের সরকারের আমলে তাঁকে ওএসডি করা হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে তিনি অবসরে যান। তাঁর বক্তব্য থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—কোনো কর্মকর্তা যদি একটি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি প্রতিরোধে আত্মবিশ্বাসী হন এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন, তাহলে সেই পরিকল্পনা যাচাই করে তাঁকে কাজের সুযোগ দেওয়া হবে না কেন? অবশ্য কোনো কর্মকর্তার দাবি বা আত্মবিশ্বাসই তাঁর সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। তবে যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে তাঁর পরিকল্পনা পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়নের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। নির্ধারিত সময় শেষে ফলাফল পরিমাপ করে দেখা সম্ভব, তাঁর উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়েছে। একইভাবে, সরওয়ার আলমের সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও আলোচনার দাবি রাখে। প্রায় ছয় মাস দায়িত্ব পালনকালে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে তিনি অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন বলে আমার জানা। তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের একাংশের মধ্যেও ইতিবাচক আলোচনা হয়েছিল। তাঁকে জেলা প্রশাসকের পদ থেকে প্রত্যাহারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ ও তাঁকে ফিরিয়ে আনার দাবিও দেখা যায়। তাঁর সমর্থকদের একাংশ মনে করেছিলেন, জনস্বার্থে নেওয়া উদ্যোগগুলোর ফলাফল মূল্যায়ন এবং সেগুলো আরও এগিয়ে নেওয়ার জন্য তাঁকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া উচিত ছিল।
এখানে উদ্দেশ্য কোনো কর্মকর্তার পক্ষে অন্ধভাবে অবস্থান নেওয়া নয়। প্রশাসনিক বদলি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ এবং এর পেছনে বিভিন্ন বৈধ কারণ থাকতে পারে। তবে কোনো কর্মকর্তা জনস্বার্থে উদ্যোগ গ্রহণ করলে তাঁর কাজের ফলাফল নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা সম্পর্কে যথাসম্ভব স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি। কোনো একজন জেলা প্রশাসকের ভালো উদ্যোগ তাঁর পদায়ন পরিবর্তনের সঙ্গে যেন হারিয়ে না যায়। সফল উদ্যোগগুলো চিহ্নিত করে অন্য জেলাতেও প্রয়োগ করা যেতে পারে। একজন কর্মকর্তাকে মূল্যায়ন করার অর্থ তাঁকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখা নয়; বরং তাঁর কাজের ইতিবাচক দিকগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া।
১. সৎ জনসেবার মূল্য: ওয়াহিদুজ্জামান সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা; ওয়াহিদুজ্জামান সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এই আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ভূমি জরিপ ও ভূমি রেকর্ডস-সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল। সেই সাক্ষাতের ভিত্তিতে তাঁর সততা, দায়িত্ববোধ ও পেশাগত আদর্শ সম্পর্কে আমার মধ্যে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। তাঁর সম্পূর্ণ কর্মজীবনের প্রতিটি দিক সম্পর্কে আমার বিস্তারিত জানা নেই। তাই তাঁর বিষয়ে আমার বক্তব্য ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চাই। তবে এই অভিজ্ঞতা আমাকে একটি বৃহত্তর বিষয় উপলব্ধি করিয়েছে: বাংলাদেশের প্রশাসনে এমন ব্যক্তিরা রয়েছেন, যাঁদের সততা ও পেশাগত আদর্শ থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একজন কর্মকর্তা অবসরে গেলে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ও প্রশাসনিক দক্ষতা যেন হারিয়ে না যায়। যাঁরা কর্মজীবনে সততা ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা প্রশিক্ষণ, পরামর্শদান এবং প্রশাসনিক সংস্কারে কাজে লাগানো যেতে পারে। সততাকে মূল্যায়ন করা মানে শুধু দুর্নীতি না করাকে স্বীকৃতি দেওয়া নয়; বরং সততা ও দক্ষতার মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়, সেই জ্ঞানকেও কাজে লাগানো। ১. রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সৎ কর্মকর্তাদের সমন্বয়েই দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ; দুর্নীতি প্রতিরোধে শুধু ভালো বক্তব্য বা নীতিগত ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, উপযুক্ত সম্পদ, প্রশাসনিক স্বাধীনতা এবং কাজের ফলাফল মূল্যায়নের নিরপেক্ষ ব্যবস্থা। কোনো কর্মকর্তা যদি দাবি করেন যে তিন বা ছয় মাসের মধ্যে একটি দপ্তরের দুর্নীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব, তাহলে তাঁর পরিকল্পনা যাচাই করে পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়নের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এ জন্য প্রথমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে হবে। এরপর সরকারি সেবা পেতে কত সময় লাগছে, অভিযোগের নিষ্পত্তি কতটা হচ্ছে, অডিটে কী ধরনের অনিয়ম পাওয়া যাচ্ছে এবং নাগরিকদের হয়রানি কমছে কি না—এসব সূচকের ভিত্তিতে অগ্রগতি পরিমাপ করা যেতে পারে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে আইনসম্মতভাবে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা দিতে হবে। একই সঙ্গে তাঁর কাজের জন্য তাঁকে জবাবদিহিও করতে হবে। যেসব উদ্যোগ কার্যকর প্রমাণিত হবে, সেগুলো অন্য দপ্তরেও প্রয়োগ করা যেতে পারে।
তবে সৎ কর্মকর্তাদের কাজের সুযোগ দেওয়াই যথেষ্ট নয়। তাঁদের উদ্যোগ সফল করার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের সহযোগিতা প্রয়োজন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে যদি রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা ক্ষমতার প্রভাব বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে প্রশাসনিক সংস্কারের প্রত্যাশিত ফল অর্জন কঠিন হবে। এ কারণে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সর্বস্তরে একটি সুস্পষ্ট নীতি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি: দুর্নীতির অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হবে, অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং কাউকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে না।
১. শীর্ষ থেকে তৃণমূল: রাজনৈতিক সততা ও জবাবদিহিই দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের ভিত্তি; একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসন পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং নিজ নিজ আইনগত দায়িত্ব পালন করে জনগণের কল্যাণে কাজ করে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব নীতি নির্ধারণ করবে, আর সরকারি কর্মকর্তারা আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করে সেই নীতি বাস্তবায়ন করবেন। উভয় ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি, পদোন্নতি ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট মানদণ্ড থাকা উচিত। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তা যাচাই করতে হবে। একইভাবে, কোনো কর্মকর্তা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করার কারণে প্রতিকূল আচরণের শিকার হয়েছেন বলে বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ উঠলে সেটিও যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সৎ কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করার অর্থ তাঁদের সব সিদ্ধান্তকে প্রশ্নাতীত বলে মেনে নেওয়া নয়। কোনো কর্মকর্তার সততার সুনাম তাঁকে আইন ও জবাবদিহির ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারে না। একই নীতি রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ক্ষমতাসীন, বিরোধী দল কিংবা স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক ব্যক্তি—কেউই আইনসম্মত জবাবদিহির বাইরে থাকতে পারেন না। সরকারের উচিত এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে সেবার মান, দুর্নীতি প্রতিরোধ, নাগরিক সন্তুষ্টি এবং সরকারি সম্পদের সঠিক ব্যবহারের ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের কাজ মূল্যায়ন করা হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃত্বের কর্মকাণ্ডেও স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এভাবে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের পরিবর্তে কর্মফল, আইন এবং জনস্বার্থ রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
উপসংহার: দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সম্মিলিত দায়িত্ব; দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য শুধু কঠোর বক্তব্য, রাজনৈতিক অঙ্গীকার কিংবা প্রশাসনিক নির্দেশ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন একটি রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি, যেখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সর্বস্তরে সততা নিশ্চিত হবে, সৎ কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাবেন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইনসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণে তাঁরা প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা পাবেন। ওয়াহিদুজ্জামান সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং মাহবুব আলম মিলন ও সরওয়ার আলমকে ঘিরে আলোচনাগুলো একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আনে—সততা, দক্ষতা ও জনস্বার্থে কাজ করার আগ্রহকে আমরা কীভাবে রাষ্ট্রের শক্তিতে পরিণত করতে পারি? এর উত্তর খুঁজতে হলে সৎ কর্মকর্তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে, তাঁদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে এবং বাস্তবসম্মত সংস্কার উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত সব রাজনৈতিক নেতা ও রাজনীতিবিদকে নিজেদের আচরণে সততা ও জবাবদিহির দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের কোনো পর্যায় থেকে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হলে, অসৎ ব্যক্তিদের রক্ষা করা হলে কিংবা সৎ কর্মকর্তাদের আইনসম্মত কাজে বাধা সৃষ্টি করা হলে দুর্নীতিবিরোধী প্রচেষ্টা দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান হতে হবে সর্বস্তরে, এবং জবাবদিহির নীতি হতে হবে সবার জন্য সমান। সরকারের প্রতি আহ্বান, সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা ও উদ্যোগকে গুরুত্ব দিন। তাঁদের বাস্তবসম্মত প্রস্তাব বাস্তবায়নের সুযোগ দিন, কাজের ফলাফল নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করুন এবং জনস্বার্থে দায়িত্ব পালনকারীদের যথাযথ স্বীকৃতি দিন। একই সঙ্গে সব পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বের আচরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করুন। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব কোনো একক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা গোষ্ঠীর নয়। এটি রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন এবং সমগ্র সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সততা, সৎ কর্মকর্তাদের নিষ্ঠা এবং কার্যকর জবাবদিহি একসঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হলেই এই প্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথ সুগম হবে। সৎ রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সৎ কর্মকর্তার বিকল্প নেই। শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সততা প্রতিষ্ঠিত হোক, রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রশাসনিক দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত হোক, আর জবাবদিহি হোক রাষ্ট্র পরিচালনার অবিচ্ছেদ্য ভিত্তি। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠুক দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক ও জনকল্যাণমুখী বাংলাদেশ।
লেখক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রাবন্ধিক, অবঃ সলিসিটর, সিনিয়র কোর্টস অব ইংল্যান্ড
সাবেক মেয়র, টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল, যুক্তরাজ্য।
