শুক্রবার | অক্টোবর ৩০, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ ঠাকুরগাঁওয়ে শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হলো উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ, চলছে গণনা

উপনির্বাচনের পরিস্থিতি, বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত

ঠাকুরগাঁওয়ে শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হলো উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ, চলছে গণনা

মো: আসাদুজ্জামান আসাদ, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ঠাকুরগাঁও-১ (সদর, রুহিয়া ও ভুল্লী) আসনের উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেল ৪টায় ভোটগ্রহণ শেষে গণনা শুরু হয়েছে। কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল সংগ্রহ ও সমন্বয়ের পর আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করা হবে। এর আগে সকাল ৮টা থেকে আসনটির ১৮৫টি কেন্দ্রে একযোগে ভোটগ্রহণ শুরু হয়।

আজ বৃহস্পতিবার সারাদিন সরেজমিনে বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে ভোটারদের শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে দেখা গেছে। কোথাও কোনো ধরনের সহিংস পরিস্থিতি ঘটেনি। নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ভোটারদের পরিচয় যাচাই করে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়।

এদিন সকালে ভোটারদের উপস্থিতি কম দেখা গেলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিতি বাড়তে থাকে। বিকেল ৩টা পর্যন্ত ৫২ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানিয়েছিল নির্বাচন কার্যালয়। তবে বিকেল ৪টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর মোট কত শতাংশ ভোট পড়েছে তা এখনো জানা যায়নি।

বিভিন্ন বয়সী ভাটারদের উপস্থিতিতে ভোটকেন্দ্রে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। বয়সের ভারে ন্যুব্জ ৮০ বছর বয়সী হাফিজা বেগম বোনের হাত ধরে আসেন ভোটকেন্দ্রে। ভোট দিতে আসার অনুভূতি জানিয়ে তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, বয়স হয়েছে, কোমরের হাড় ক্ষয়ে গেছে। ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারি না। তবুও আজ ভোট দিতে এসেছি ভাতিজির হাত ধরে।

এছাড়া তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল নজরকাড়া। প্রথমবার ভোট দেওয়ার অনুভূতি জানাতে গিয়ে কেউ কেউ আপ্লুত হয়ে পড়েন। আবার অনেকেই আট মাসের ব্যাবধানে দ্বিতীয়বার ভোট দিতে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার পর কেউ কেউ সেই মুহূর্তের স্মৃতি ধরে রাখতে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে শেয়ার করেন।

আরমান আলী ও মোবারল আলী নামের দুই তরুণ ভোটার বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমি ভোটার হলেও ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারিনি। কিন্তু এবার আট মাসের ব্যবধানে দুইবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। এটা আমার জন্য সত্যিই আনন্দের। তাই এই মুহূর্তটিকে স্মৃতি হিসেবে ধরে রাখতে ফেসবুকে শেয়ার করেছি।

‘কখনো ভাবিনি, একই আসনে কয়েক মাসের ব্যবধানে দুইবার ভোট দিতে পারব। নতুন ভোটার হিসেবে এবার ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা ফেসবুকে শেয়ার করেছি। আগে শুনেছি, ভোটাররা ঠিকভাবে ভোট দিতে পারতেন না, কেন্দ্রে যাওয়ার আগেই তাদের ভোট দেওয়া হয়ে যেত। কিন্তু এবার ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের ভোট নিজে দিতে পেরেছি। ভোটারদের জন্য কেন্দ্র অপেক্ষা করছে এমন অনুভূতি সত্যিই ভালো লাগার।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নতুন নারী ভোটার এভাবেই তার অনুভূতি প্রকাশ করেন।

এদিকে উপনির্বাচন ঘিরে ভোটকেন্দ্রগুলোতে নেওয়া হয়েছিল কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। পুলিশের পাশাপাশি মাঠে দায়িত্ব পালন করেছেন স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা। ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছিল সতর্ক অবস্থানে।
তবে এদিন সকালে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে দেখা যায়। এর মধ্যে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেন। এরপর তিনি ঠাকুরগাঁও সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্র পরিদর্শনে যান। সেখানে পরিদর্শন শেষে তিনি অভিযোগ করে বলেন, ডাব মার্কার এজেন্টরা সবাই জামায়াতের এজেন্ট হয়ে গেছে। জামায়াতের এজেন্টরা ডাব মার্কার কাগজ নিয়ে ঢুকে গেছে।

অপরদিকে, জামায়াত ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঠাকুরগাঁও পৌর শহরের হাজীপাড়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেন। এরপর তিনি অভিযোগ করে বলেন, ভোটকেন্দ্রে এসে প্রথমেই আমার কাছে যে বিষয়টি উদ্বেগজনক মনে হয়েছে, প্রিজাইডিং অফিসারের কার্ডে কোনো ছবি নেই। যতটুকু শুনলাম, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার যারা রয়েছেন তাদের গলার কার্ডেও ছবি নেই। যিনি এখানে প্রিজাইটিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করছেন তার যদি ছবি না থাকে তাহলে কীভাবে বুঝব উনিই ওই ব্যক্তি, অন্য ব্যক্তিও তো এখানে প্রক্সি দিতে পারেন, এটি খুবই উদ্বেগজনক।

এ ছাড়া ভোটগ্রহণ শেষে জামায়াত প্রার্থী অভিযোগ করে বলেন, আমরা লক্ষ্য করেছি ২০ থেকে ২৫টা ব্যালট বইয়ে তারা আগে থেকে সিল মেরে রেখেছে, যেটা খুবই উদ্ভেগজনক। কারণ সিল যদি আগেই মারা থাকে তাহলে চোখের ইশারায় বিএনপির যারা ভোটার আছেন তাদের ৪টা পর্যন্ত ব্যালট পেপার ছিড়ে দেওয়া সম্ভব। এটা যে হয়নি সেটাও বলা যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে আমাদের কাছে অভিযোগ আসছে দু-তিনটা ব্যালট পেপার দিয়ে তাদের সহযোগিতা করছে। জাল ভোট দিতে গিয়ে ইতোমধ্যে পাঁচ থেকে ছয়জন বিএনপি কর্মী ধরা পড়েছে। কেন্দ্রগুলোতে দেখবেন নির্বাচনী আচরণ বিধি লঙ্ঘন করে ধানের শীর্ষের প্রতীকসহ গেঞ্জি নিয়ে তারা অবাধে সেন্টারের বুথে ঢুকেছেন এবং সেখানে ভোট প্রদান করেছেন। আমরা সেটি প্রশাসনের দৃষ্টি গোচর করেছি।

নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের তিন উপজেলায় মোট ১৮৫টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায় ১১৩টি, নবগঠিত রুহিয়া উপজেলায় ৩৩টি এবং ভুল্লী উপজেলায় ৩৯টি কেন্দ্র।

এ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ১৫ হাজার ৮৫৩ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫৭ হাজার ২১৯ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৫৮ হাজার ৬৩০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার চারজন। এ ছাড়া পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন ২৮৭ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ২৪৯ জন এবং নারী ৩৮ জন।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ছয়জন প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়। তারা হলেন, বিএনপির মির্জা ফয়সল আমীন ও মো. ওবায়দুল্লাহ মাসুদ, জামায়াতে ইসলামী ও সমমনা দলগুলোর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন, হাফেজ ডা. মো. খাদেমুল ইসলাম, মো. আবদুল আলীম নিজামী এবং হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক। তবে ৫ অক্টোবর দলীয় সিদ্ধান্তে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন বিএনপির জেলা সহসভাপতি মো. ওবায়দুল্লাহ মাসুদ। ফলে চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন পাঁচজন। তাদের মধ্যে বিএনপির মির্জা ফয়সল আমীন ও জামায়াতে ইসলামী এবং সমমনা দলগুলোর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।

উল্লেখ্য, বিগত ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদকে ২৫৫ ভোটে পরাজিত করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি শূন্য হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আসনটিতে উপনির্বাচনের আয়োজন করা হয়েছে।

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জয়ী হন। তিনি পেয়েছিলেন ২ লাখ ২৮ হাজার ৭৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন পেয়েছিলেন ১ লাখ ৩২ হাজার ৫৮৪ ভোট।

এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. খাদেমুল ইসলাম পেয়েছিলেন ৩ হাজার ৮৩৩ ভোট। ওই নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় আসনটি শূন্য হয়। এখন উপনির্বাচনের ভোটের মধ্য দিয়ে এ আসনের নতুন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা