নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার : কক্সবাজারের খরুলিয়ায় পূর্বশত্রুতা ও রাজনৈতিক বিরোধের জেরে খুরশেদ নামে এক ব্যক্তির বসতবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের দাবি, রাত ১১টার দিকে দা, কিরিচ ও ছুরি নিয়ে ২৫ থেকে ৩০ জনের একটি দল বাড়িতে হামলা চালিয়ে দরজা-জানালা ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। এ সময় পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি দেখানোর পাশাপাশি স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা লুট করে নেওয়া হয়। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ কেউ হামলাকারীর সংখ্যা ৩০ থেকে ৫০ জন বলে দাবি করেছেন।
এ ঘটনার সূত্রপাত নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে। একই রাতে স্থানীয় সাঈদ নামের এক ব্যক্তির ওপর ছুরিকাঘাত ও তাঁর সঙ্গে থাকা ২২ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে খুরশেদকে সন্দেহ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে তাঁর পরিবার। অন্যদিকে, খুরশেদের স্বজনদের দাবি, পূর্বের রাজনৈতিক বিরোধের জেরে তাঁকে ফাঁসানোর চেষ্টা চলছে। দুই ঘটনার প্রকৃত যোগসূত্র এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
খুরশেদের পরিবারের অভিযোগ, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিএনপির পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা এবং দলীয় মিছিল-মিটিংয়ে সক্রিয় ছিলেন। তিনি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গেও সম্পৃক্ত। নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সাঈদের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয়। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে একাধিকবার কথা-কাটাকাটিও হয়েছে।
পরিবারের ভাষ্য, গত ১ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টার দিকে সাঈদ দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে আহত হয়েছেন বলে তাঁরা জানতে পারেন। এ ঘটনায় খুরশেদকে সন্দেহ করার পর রাত ১১টার দিকে সাঈদের ভাগিনা হাবিবের নেতৃত্বে ২৫ থেকে ৩০ জনের একটি দল তাঁদের বাড়িতে হামলা চালায়। হামলাকারীরা দরজা-জানালা, আসবাবপত্র ও বাড়ির চারপাশের ঘেরাও ভাঙচুর করে।
খুরশেদের পরিবারের দাবি, হামলাকারীরা তাঁর সদ্যবিবাহিত বড় ভাইয়ের স্ত্রীর ৮ ভরি স্বর্ণালংকার, মায়ের ৩ ভরি স্বর্ণালংকার এবং নগদ ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নিয়ে যায়। এ ঘটনায় পরিবারের সদস্যরা আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মো. হোসেন জানান, বাড়ির চারপাশে চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে তিনি বাইরে বের হন। এ সময় জিয়াউর রহমানসহ কয়েকজন তাঁকে কিরিচ দিয়ে ঘেরাও করেন। একপর্যায়ে জিয়াউর রহমান তাঁর হাতে থাকা কিরিচ হোসেনের কাঁধের ওপর রেখে ভয়ভীতি দেখান। পরে তাঁদের মধ্যে হাতাহাতি হয়। তাঁর স্ত্রী ও বাইরে থাকা কয়েকজনের সহযোগিতায় তাঁকে ঘরের ভেতরে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। জানালা দিয়ে তিনি দেখতে পান, হামলাকারীরা দা, ছুরি ও কিরিচ দিয়ে বাড়ির দরজা-জানালায় কোপাচ্ছে এবং ঘেরাও ভাঙচুর করছে।
পাশের বাড়ির আরেক নারী প্রত্যক্ষদর্শী জানান, চিৎকার শুনে ঘর থেকে বের হয়ে তিনি ৩০ থেকে ৫০ জনের মতো লোককে দা ও কিরিচ হাতে বাড়ির দরজা-জানালায় কোপাতে দেখেন। প্রতিবাদ করতে এগিয়ে গেলে তাঁকে মারতে তেড়ে আসে হামলাকারীরা। একপর্যায়ে প্রাণভয়ে তিনি সরে যান। এ সময় তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
খুরশেদের মা জানান, ঘটনার দিন তাঁর ছেলে রামুর কাউয়ারকুপে একটি কাজে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে তাঁদের পক্ষ হয়ে ঈদগাঁওয়ে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যান এবং রাতেও সেখানেই অবস্থান করেন। তাঁর প্রশ্ন, ছেলে অন্য এলাকায় থাকার পরও কীভাবে তাঁকে এ ঘটনার সঙ্গে জড়ানো হলো?
তিনি বলেন, সাঈদের ওপর হামলার ঘটনায় তাঁর ছেলে জড়িত থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তা প্রমাণ করে আইনের আওতায় আনা হোক। আর জড়িত না থাকলে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁকে ফাঁসানোর চেষ্টা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিবারের ওপর হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িতদের বিচার দাবি করেন তিনি।
এ ঘটনায় ঝিলংজা ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি আব্দুল আজিজ রুবেল খুরশেদের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, খুরশেদ দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিগত কমিটি থেকে শুরু করে ওয়ার্ড পর্যায়ে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল এবং ওই আন্দোলনে তিনি আহত হয়েছিলেন।
রুবেলের দাবি, খুরশেদের বিরুদ্ধে চুরি কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কোনো অভিযোগ তাঁদের জানা নেই। নির্বাচনী প্রচারণার সময় সাঈদ তাঁকে বিএনপির পক্ষে প্রচারণা না চালানো এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট না চাইতে হুমকি দিয়েছিলেন বলে খুরশেদ তাঁকে জানিয়েছিলেন।
রুবেল আরও বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনায় খুরশেদের নাম জড়িয়ে বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে তাঁর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও সাংগঠনিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে তাঁরা মনে করছেন। সরেজমিনে গিয়ে তাঁরা বাড়ির আসবাবপত্র ও বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুরের চিত্র দেখেছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা লুট এবং তাঁর মা ও চাচার ওপর হামলার অভিযোগও করা হয়েছে।
তিনি প্রশাসনের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে হামলায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান। একই সঙ্গে বলেন, ছাত্রদলের কোনো নেতাকর্মী এ ঘটনায় জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধী যে দলেরই হোক, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
অন্যদিকে, সাঈদের ওপর হামলার ঘটনা নিয়েও ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁকে উদ্ধারকারী এক যুবক জানান, ঘটনার সময় তিনি বাড়িতে বসে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছিলেন। দুই থেকে তিনটি মোটরসাইকেলের শব্দ শুনে বাইরে বের হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় সাঈদকে পড়ে থাকতে দেখেন। পরে তাঁরা তাঁকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সাঈদের মাথা, হাত ও পেটসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল বলে জানান ওই যুবক।
মুঠোফোনে আহত সাঈদ দাবি করেন, ঘটনার সময় চারপাশ অন্ধকার ছিল। দুটি মোটরসাইকেলে আসা ব্যক্তিরা তাঁর পথরোধ করে ছুরিকাঘাত করে এবং সঙ্গে থাকা নগদ ২২ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয়। হামলাকারীদের একজনকে চিনতে পেরেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে ছিনতাইয়ের টাকার পরিমাণ ও ঘটনার বিবরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে খুরশেদের পরিবার। তাঁদের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই ঘটনা নিয়ে একটি পোস্টে ২২ লাখ এবং অন্য একটি পোস্টে ২৫ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্ধকারের মধ্যে সাঈদ কীভাবে একজনকে শনাক্ত করলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। তবে ছিনতাইয়ের প্রকৃত পরিমাণ ও হামলাকারীদের পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
খুরশেদের বোন অভিযোগ করেন, সাঈদ ও তাঁর সহযোগীদের মধ্যে ইয়াবা ব্যবসার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের জেরেই এ ঘটনার সূত্রপাত হতে পারে। তাঁর দাবি, সেই বিরোধের দায় খুরশেদের ওপর চাপিয়ে তাঁকে মামলায় জড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি সাঈদের মাদক ব্যবসায় সম্পৃক্ততার অভিযোগও করেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং সাঈদের বক্তব্যও এ বিষয়ে জানা সম্ভব হয়নি।
খুরশেদের বোন বলেন, তাঁর ভাই কোনো অপরাধ করে থাকলে তদন্তের মাধ্যমে বিচার হোক। কিন্তু সেই অভিযোগের জেরে তাঁদের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও স্বর্ণালংকার-নগদ টাকা লুটের ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের বিচার দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তদন্তের পরই ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটিত হবে।
দুই ঘটনায় পাল্টাপাল্টি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন খুরশেদের পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের বক্তব্য, সাঈদের ওপর হামলার ঘটনায় খুরশেদের সম্পৃক্ততা থাকলে আইন অনুযায়ী বিচার হোক। তবে একই সঙ্গে তাঁদের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগেরও সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
