ফরহাদ রহমান, টেকনাফ প্রতিনিধি : কক্সবাজারের টেকনাফে সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের কবল থেকে উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনকে থানায় হস্তান্তর করেছে যৌথ বাহিনী। বৃহস্পতিবার হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গীখালীর দুর্গম পাহাড়ে অভিযান চালিয়ে তাঁদের উদ্ধার করা হয়। এ সময় মানব পাচারকারীদের গুলিতে এক সেনাসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনায় পুরো এলাকায় উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
শুক্রবার সকালে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়। তাঁদের পরিচয় ও প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই-বাছাই করছে পুলিশ।
এদিকে পাহাড়ে সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের একের পর এক আস্তানা গড়ে ওঠায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। অপরাধীদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে পাহাড়জুড়ে সমন্বিত সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরা। সেনাসদস্য নিহতের প্রতিবাদে শুক্রবার জুমার নামাজের পর টেকনাফের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধনের ডাক দিয়েছেন ছাত্র প্রতিনিধিরা।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার বিকেলে রঙ্গীখালীর দুর্গম পাহাড়ে মানব পাচারকারীদের আস্তানায় যৌথ বাহিনী অভিযান চালায়। এ সময় সশস্ত্র পাচারকারীদের সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। পাচারকারীদের ছোড়া গুলিতে সেনাবাহিনীর সৈনিক মো. তিতাস শেখ (২৭) নিহত হন।
অভিযানে মানব পাচারকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, একটি দেশীয় তৈরি বন্দুক ও চার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযানে সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন, বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা অংশ নেন।
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, পাহাড় থেকে উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনকে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তাঁদের পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
তিনি জানান, অভিযানের পর প্রাথমিকভাবে ৫৭ জনকে উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে যাচাই-বাছাই করে তাঁদের মধ্যে একজনকে দালাল হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
আট দিন ঝুপড়িতে বন্দি, দুবার পালানোর চেষ্টা
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের একজন ফরিদপুরের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান। থানা হেফাজতে তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, আট দিন ধরে তাঁকে পাহাড়ের একটি ঝুপড়ি ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। দুবার পালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তিনি।
আসাদুজ্জামানের ভাষ্য, কক্সবাজারের একটি সেতুতে কাজ করার সুবাদে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইমামুল নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে ক্যাম্পে কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আট দিন আগে তাঁকে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে যাওয়ার পর তাঁর মোবাইল ফোনসহ সঙ্গে থাকা সবকিছু কেড়ে নেওয়া হয়। রাতে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে তাঁকে পাহাড়ে নিয়ে মানব পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, পাহাড়ে পৌঁছে দেখেন, তাঁর মতো আরও অর্ধশতাধিক মানুষকে আটকে রাখা হয়েছে। সেখানে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি সশস্ত্র পাহারাদল ছিল।
আসাদুজ্জামান আরও জানান, দুই দিন আগে শতাধিক নৌকাসহ একটি ট্রলার সাগরপথে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তাঁকেসহ আরও পাঁচজনকে সেখানে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও জায়গা না থাকায় সেদিন ট্রলারে তোলা হয়নি। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার তাঁদের পাচারের পরিকল্পনা ছিল। এর আগেই যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে।
এক লাখ টাকায় বিক্রির অভিযোগ
উদ্ধার হওয়া উখিয়ার সেবতখালীর বাসিন্দা মো. সাইফুল ও মিজানুর রহমান সাগরের অভিযোগ, কাজ দেওয়ার কথা বলে নূরালী নামের এক দালাল তাঁদের মানব পাচারকারীদের হাতে তুলে দেন। পরে পাচারকারীদের কাছ থেকেই তাঁরা জানতে পারেন, তাঁদের দুজনকে এক লাখ টাকায় কেনা হয়েছে।
তাঁরা জানান, পাঁচ দিন ধরে পাহাড়ের ওই আস্তানায় বন্দি ছিলেন। প্রতিদিন চার-পাঁচজন করে নতুন মানুষ সেখানে আনা হতো। কেউ প্রতিবাদ করলে তাঁকে মারধর করা হতো। পালানোর চেষ্টা করায় তাঁদেরও নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।
তাঁদের অভিযোগ, দিনে মাত্র দুই বেলা খাবার দেওয়া হতো। খাবার হিসেবে দেওয়া হতো কাঁচা কদু ও ডাল। ক্ষুধা ও নির্যাতনে তাঁদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছিল। বৃহস্পতিবার তাঁদের ট্রলারে তুলে সাগরপথে পাচারের পরিকল্পনা ছিল। তার আগেই যৌথ বাহিনী তাঁদের উদ্ধার করে।
পাহাড়জুড়ে সাঁড়াশি অভিযানের দাবি
হ্নীলার স্থানীয় বাসিন্দা নুর আলম বলেন, পাহাড়ে সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের আস্তানা নির্মূলে ব্যাপক অভিযান প্রয়োজন। প্রতিদিনই পাহাড়ে গুলির শব্দ শোনা যায়। বাহারছড়া, হ্নীলা ও হোয়াইক্যংয়ের বিভিন্ন পাহাড়ে সশস্ত্র অপরাধীদের আস্তানা গড়ে ওঠায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। এসব আস্তানা একযোগে নির্মূল করা না গেলে অপরাধীদের নেটওয়ার্ক ভাঙা কঠিন হবে।
হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, পাহাড়কেন্দ্রিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে শীত মৌসুমে মানব পাচারকারীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। বৃহস্পতিবার পাচারকারীদের আস্তানায় গোলাগুলিতে একজন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরেছে। সাধারণ মানুষ অপরাধীদের কাছে অনেকটা অসহায়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযান জরুরি।
অপরাধীদের ছাড় দেওয়া হবে না: ইউএনও
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, পাহাড়ে অবস্থানরত সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। অপরাধ করে কারও পার পাওয়ার সুযোগ নেই। মানববন্ধনের বিষয়েও প্রশাসন খোঁজখবর রাখছে।
সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনরত একজন সেনাসদস্য সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক। এ ধরনের অপরাধ নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন।
