মহম্মদপুর (মাগুরা) প্রতিনিধি : মাগুরার মহম্মদপুরে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী জনপ্রিয় লাঠি খেলা দেখতে হাজারো নারী পুরুষের উপচে পড়া ভিড়। নানা বয়সি মানুষের উপস্থিতিতে আনন্দঘন ও উৎসবমূখর পরিবেশের সৃষ্টি হয় এলাকাজুড়ে। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকালে আবহমান গ্রাম-বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য ১০৬তম এই লাঠি খেলার জমজমাট আসর বসেছিল উপজেলার বাবুখালি ইউনিয়নের ডুমুরশিয়া ডি.সি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের খেলার মাঠে।
গাঁওয়ের ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টায় ডুমুরশিয়া বাজার বণিক সমিতি প্রতিবছর এই খেলার আয়োজন করে থাকে। শতবছরের দৃষ্টিনন্দন এই আয়োজন দেখতে হাজির হয়েছিল পার্শ্ববর্তী শালিখা, শ্রীপুর, বোয়ালমারী ও মধুখালী উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা নানা বয়সের অসংখ্য দর্শক। নারী দর্শকদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। বার্ষিক এই লাঠি খেলা ও গ্রামীণ মেলা বসে প্রতিবছর বাংলা কার্তিক মাসে। মেলায় নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীসহ নানা ধরনের পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছে ডুমুরশিয়া বাজার ও খেলার মাঠ এলাকাজুড়ে।
গ্রামীণ মানুষের মধ্যে আনন্দ উৎসব ফিরিয়ে আনা এবং হারিয়ে যেতে বসা গ্রাম-বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর বলে জানান লাঠি খেলা অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সংস্কৃতিমন্ত্রী এ্যাড. নিতাই রায় চৌধুরী-এমপি। লাঠি খেলা উদ্বোধনকালে তিনি বলেন, লাঠি খেলা গ্রামবাংলার অত্যন্ত প্রাচীন ও জনপ্রিয় একটি খেলা। লাঠি, হাডুডু, দাড়িয়াবান্ধা ও নৌকা বাইচের মতো গ্রামবাংলার জনপ্রিয় খেলাগুলো তরুণ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে সারাদেশে উদ্যোগ নিয়েছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এক বৈচিত্র্যময় দেশ। এ দেশে রয়েছে হাজার রকমের গ্রামীণ সংস্কৃতি। লাঠিখেলা যার মধ্যে অন্যতম একটি গ্রামীণ সংস্কৃতি। আর এই খেলাকেই এক সময় আয়ের অবলম্বন হিসেবে বেচে নিয়ে ছিল কিছু পরিবার। মানুষকে আনন্দ দিয়ে উপার্জন করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতো। কিন্তু এখন বিলুপ্তের পথে প্রায় এ খেলাটি।
আবহমান গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী জনপ্রিয় খেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম লাঠিখেলা, কালের পরিক্রমায় দিনদিন হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী জনপ্রিয় এই খেলাটি। একই সঙ্গে এই খেলার সাথে সংশ্লিষ্ট যারা তাদেরও জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। অনেকেই এ পেশা পরিবর্তন করে ঝুঁকে পড়েছেন অন্য পেশায়। ছেড়ে দিয়েছেন ঐতিহ্যবাহী পুর্বপুরুষের এ পেশা। তারপরেও অনেকেই ধরে রাখার চেষ্টা করে চলেছেন। তারই ধারাবাহিকয়তায় শত প্রতিকূলতার মাঝেও বাঙালির গ্রামীণ সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে লালন করার চেষ্টা আর প্রাচীন এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার লক্ষ্যে ডুমুরশিয়া বাজার বণিক সমিতি প্রতিবছর ঐতিহ্যবাহী এই লাঠি খেলার আয়োজন করে থাকে।
বিভিন্ন এলাকা থেকে আশা লাঠিয়াল দলগুলো বর্ণিল সাজে লাঠি হাতে অংশ নেয় এই খেলায়। ঢাকঢোল আর বাঁশির তালে লাঠিয়ালদের লাঠির চক্রে আনন্দে উল্লাসে মেতে উঠে আমুদে দর্শক। নানা রঙের লাঠি ও রং-বেরঙের পোশাক পরে মাঠে নামেন লাঠিয়ালেরা। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চলে লাঠির ব্যবহার। ত্বকে মুখে ছিল ঠেকাও লাঠি, আঘাত লাগবে না কিন্তু পয়েন্ট পেতে হবে এটাই খেলা। উপস্থিত দর্শকদের উচ্ছ্বাস প্রমাণ করে দেয় তাদের মনে লাঠি খেলা কতটা জনপ্রিয়। এই খেলাটি নিয়ে মানুষের আগ্রহ এখনো অটুট রয়েছে।
তবে লাঠি খেলার নতুন দল তৈরী করা সম্ভব হচ্ছে না। এ জন্য লাঠি খেলার আয়োজন করা যায় না। কিন্তু যারা লাঠি খেলেন, তাদের এই গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ধরে রাখার আগ্রহ আছে বলে মন্তব্য করেন আয়োজক কমিটির সভাপতি ও ডুমুরশিয়া বাজার বণিক সমিতির সভাপতি মো. আবুল হোসেন।
লাঠিয়াল দলের প্রধান মানিক সরদার বলেন, ছোট বেলা পূর্বপুরুষদের খেলা দেখে লাটি খেলায় আগ্রহ হয়। তারপর থেকে এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু এখন আর এ খেলার তেমন আয়োজন করা হয় না। তবে প্রতিবছর কার্তিক মাসে এখানে আয়োজন করা হয় গ্রাম-বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী এই লাঠি খেলা, এখানে এসে ভালো লাগে। এতে নতুন প্রজন্মের মধ্যেও আগ্রহ সৃষ্টি হয়।
ঢাকা থেকে আগত কবি হাফিজ রহমান এবং কবি সাদী মোহাম্মদ জানান, বর্তমান ক্রীকেট ও ফুটবলের জনপ্রিয়তায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা। আমাদের পুরোনো এই ঐতিহ্য ৬০-এর দশক থেকে প্রচলিত ও জনপ্রিয়। এই লাঠি খেলাকে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য হিসেবে বুকে ধারণ করে রাখতে স্থানীয়দের পাশাপাশি সরকারকেও এগিয়ে আসার আহ্বান লাঠি খেলার দর্শক শ্রোতা ।
