তারেক মুহম্মদ আব্দুল্লাহ রানা, শেরপুর : শেরপুরের গারো পাহাড়ে বন্যহাতি ও মানুষের সংঘাতের নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছেন কিছু কনটেন্ট ক্রিয়েটর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিউ, লাইক ও ফলোয়ার বাড়ানোর আশায় তাঁদের কেউ কেউ বন্যহাতির খুব কাছাকাছি গিয়ে ভিডিও ধারণ করছেন। আবার কেউ হাতির পিছু নিয়ে ছবি ও ভিডিও করতে গিয়ে উচ্চ শব্দ করছেন, চিৎকার-চেঁচামেচি করছেন। এতে বিরক্ত ও উত্তেজিত হয়ে উঠছে বন্যহাতি। কখনো কখনো হাতির স্বাভাবিক চলাচলও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে যে কোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শেরপুরের ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী ও শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়ে প্রায় সারা বছরই বন্যহাতির বিচরণ রয়েছে। বিশেষ করে খাবারের সন্ধানে ভারতীয় সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকা থেকে হাতির পাল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। এসব হাতি দেখতে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে উৎসুক মানুষ ভিড় করেন। তাঁদের মধ্যে কিছু কনটেন্ট ক্রিয়েটর হাতির ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে বিপজ্জনকভাবে কাছে চলে যান।
অভিযোগ রয়েছে, কেউ কেউ হাতির সামনে গিয়ে ভিডিও করেন, আবার কেউ হাতির চলাচলের পথে অবস্থান নিয়ে ভিডিও ধারণের চেষ্টা করেন। হাতি তেড়ে এলে অনেকেই দৌড়ে পালান। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে হাতি ভয় পেয়ে বা বিরক্ত হয়ে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। এতে শুধু ভিডিও ধারণকারীরাই নন, আশপাশের সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় বাসিন্দারাও বিপদের মুখে পড়তে পারেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, বন্যহাতি এমনিতেই খাদ্যসংকট, আবাসস্থল সংকোচন ও সীমান্তে চলাচলের প্রতিবন্ধকতার কারণে নানা চাপের মধ্যে রয়েছে। এর ওপর মানুষের অতিরিক্ত ভিড়, হৈচৈ এবং খুব কাছ থেকে ছবি-ভিডিও ধারণের চেষ্টা হাতিগুলোকে আরও উত্তেজিত করে তুলছে। অনেক সময় হাতির উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার ও ভিডিও তৈরির প্রতিযোগিতাও দেখা যায়।
বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বন্যহাতি বন্য পরিবেশের প্রাণী। মানুষের উপস্থিতি, শব্দ, আলো কিংবা বিরক্তিকর আচরণে হাতি আতঙ্কিত ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে হাতির পাল কিংবা বাচ্চাসহ চলাচলকারী হাতির কাছে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই হাতির ছবি ও ভিডিও ধারণের ক্ষেত্রে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে নালিতাবাড়ী উপজেলার মধুটিলা ফরেস্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা মো, আব্দুল করিম দৈনিক জনতাকে বলেন, বাধা দিয়েও টিকটকারদের দমানো যাচ্ছে না।
পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রতিযোগিতায় বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বালিজুরি রেন্জ কর্মকর্তা রাতুল সাহা রানা দৈনিক জনতাকে বলেন, বন্যহাতিকে উত্ত্যক্ত করে ভিডিও ধারণ করা যেমন প্রাণীটির জন্য ক্ষতিকর, তেমনি মানুষের জীবন ও সম্পদের জন্যও হুমকিস্বরূপ।
বন বিভাগ ও ইআরটি সদস্যরা সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।
বন্যহাতির সঙ্গে মানুষের সংঘাত কমাতে হলে হাতির নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বন্যহাতির কাছে গিয়ে ভিডিও ধারণ, পিছু নেওয়া, চিৎকার-চেঁচামেচি ও উত্ত্যক্ত করার বিরুদ্ধে বন বিভাগ ও প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
স্থানীয়দের দাবি, কনটেন্ট তৈরির নামে বন্যহাতিকে বিরক্ত করা বন্ধে প্রশাসন ও বন বিভাগের উদ্যোগে সতর্কতামূলক প্রচার চালাতে হবে। অন্যথায় ভিউয়ের নেশায় বন্যহাতিকে উত্ত্যক্ত করার ঘটনা একসময় প্রাণহানিসহ বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বন্যহাতিকে উত্তেজিত না করতে কনটেন্ট ক্রিয়েটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
