বৃহস্পতিবার | সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬
প্রচ্ছদ ভ্রমণ কালের ক্ষয়ে আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে জলসুখার শতবর্ষী জমিদার গিরিষ বাবুর বাড়ি

কালের ক্ষয়ে আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে জলসুখার শতবর্ষী জমিদার গিরিষ বাবুর বাড়ি

মোঃ আশিকুর রহমান,আজমিরীগঞ্জ: হবিগঞ্জে হারিয়ে যাচ্ছে জমিদারি আমলের অনেক স্মৃতি। কোথাও ভেঙে পড়েছে পুরোনো স্থাপনা, কোথাও মুছে গেছে ইতিহাসের চিহ্ন। তবে আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামে এখনো নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষী ‘গিরিষ বাবুর বাড়ি’ জীর্ণ-শীর্ণ এই ভবনটি আজ শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়, বরং একটি জনপদের অতীত ঐতিহ্য ও আভিজাত্যের আরক, সংষ্কার নাহলে আগামী প্রজন্ম জানতেও পারবে না তাদের অঞ্চলের সমৃদ্ধ অতীতের কথা। কুশিয়ারা নদীর উপশাখা কুশিয়ারার কুদালিয়ার নদীর তীরে অবস্থিত। হাওর নদী নালা বেষ্টিত এই গ্রামের প্রাকৃতিক রুপময় সৌন্দর্য অপূর্ব। পূর্ব থেকেই নদী বেষ্টিত এই ছোট গ্রাম ঐতিহ্যবাহী। ১৩ জমিদারেজলসুখা।

এই গ্রামের জমিদার বাড়ি ও জমিদারদের নিয়ে বাংলাদেশের সুনাম ধন্য লেখক হুমায়ুন আহমেদ গেটোপুত্র কমলা টেলিফিল্মের মাধ্যমে কাহিনি ও চিত্র ধারন করেছে। গ্রামে ছিল ১৩ জন জমিদারের বাস। তাদের মধ্যে ১২ জন জমিদার ছিলেন সনাতন ধর্মাবলম্বী এবং বাকি একজন মুসলিম।১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ দ্বিখন্ডিত হওয়ার পর অধিকাংশ জমিদারই চলে যান ভারতে। তাদের উত্তরসূরিরা ভারত এবং কেউ কেউ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বাস করছেন।জলসুখা গ্রামের মুরব্বিদের কাছ থেকে জানা যায় সংরক্ষিত তালিকা অনুযায়ী, জমিদাররা হলেন চন্দ্র কুমার রায়, কৃষ্ণ কুমার রায়, সূর্যমনি রায়, বৈকুণ্ঠ নাথ রায়, শরৎ চন্দ্র রায়, ভারত চন্দ্র রায়, নন্দলাল রায়, গোবিন চন্দ্র রায়, সতীশ কুমার রায়, লক্ষ্ণীকান্ত রায়, ক্ষেত্রনাথ রায়, মাধব চন্দ্র রায়, রমা বলস্নব হালদার ও রমজান আলী চৌধুরী ওরফে বুছা মিয়া চৌধুরী।

তারা একেকজন ছিলেন একেক তালস্নুক বা চৌহদ্দির খাজনা আদায়ের দায়িত্বে। আরও জানা যায়। অধিকাংশ জমিদারই ছিলেন শিক্ষানুরাগী। তাদের মধ্যে জমিদার চন্দ্র কুমার রায় ১৮৭৬ সালে ‘কৃষ্ণ গোবিন্দ উচ্চবিদ্যালয়’ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যা এর সুনাম এখন ও রয়েছে । এর মধ্যে জলসুখায় ঐতিহাসিক ‘
গিরিষ বাবুর বাড়ি কালের আবর্তে অনেক কিছুই বিলীন হয়ে যায়, কিন্তু কিছু নিদর্শন নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে জানান দেয় অতীত সমৃদ্ধি আর আভিজাত্যের কথা। এমনই এক ইতিহাসঘেরা স্মৃতির সাক্ষী হয়ে জলসুখা গ্রামে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষী ‘গিরিষ বাবুর বাড়ি’ সুরম্য কারুকার্য।

সুউচ্চ গম্বুজ আর লাল ইটের সেই জাঁকজমক আজ আর নেই; তবে জীর্ণ দেওালের নোনাধরা প্লাস্টার আর প্রাচীন কাঠামোর প্রতিটা ভাঁজে যেন আজও জমে আছে এক হারিয়ে যাওয়া সোনালী সময়ের গল্প।স্থানীয় প্রবীণদের মুখে জানা যায়, তৎকালীন জমিদারি আমল ও ব্রিটিশ শাসনের সমসাময়িক কালে জলসুখার তৎকালীন ধনাঢ্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তি গিরিষ চন্দ্রের উদ্যোগে এই বিশাল ভবনটি নির্মিত হয়। ভবনটির নির্মাণশৈলীতে তৎকালীন ঔপনিবেশিক এবং স্থানীয় স্থাপত্যরীতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন দেখা যায়।

বিশাল উঠান চুন-সুরকির মজবুত গাঁথুনি, উঁচু ছাদ এবং নান্দনিক তোরণ প্রমাণ করে সেই সময়ের রুচিশীলতা ও অভিজাত জীবনযাত্রার কথা।একসময় এই বাড়িতে বসত জমজমাট আসর। পূজা-পার্বণ, যাত্রাপাল্লা আর বিচার-শালিসে দিনরাত মুখরিত থাকত গিরিষ বাবুর আঙিনা। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসত এই প্রাসাদতুল্য বাড়িটি এক নজর দেখতে। সময়ের নিমর্ম কষাঘাতে সেই প্রাণচাঞ্চল্য আজ ইতিহাস। যত্নের অভাব, জলবায়ুর প্রভাব এবং তদারকির অভাবে বাড়িটি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ভবনের অনেক জায়গায় ফাটল ধরেছে, ছাদ থেকে খসে পড়ছে প্লাস্টার। ঘরের ভেতরের মূল্যবান কাঠের কাজ এবং কারুকার্যময় দরজা-জানালা ইতিমধ্যেই নষ্ট হয়ে গেছে। তবুও এই ধ্বংসাবশেষ দেখতে মাঝে মাঝেই ছুটে আসেন স্থানীয় তরুণ ও ইতিহাসপ্রেমী মানুষ। দেওয়ালের গায়ে হাত রাখলেই যেন পাওয়া যায় অতীত জীবনের স্পন্দন।

জলসুখা গ্রামের সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, গিরিষ বাবুর বাড়িটি কেবল একটি পুরোনো দালান নয়, এটি আজমিরীগঞ্জের স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অমূল্য অংশ। “আমাদের এলাকার এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি যদি দ্রুত সংস্কার বা সংরক্ষণ করা না হয়, তবে অচিরেই এটি মাটির সাথে মিশে যাবে। আগামী প্রজন্ম জানতেও পারবে না তাদের অঞ্চলের সমৃদ্ধ অতীতের কথা। জলসুখার গিরিষ বাবুর বাড়িটি এখন ইতিহাসের এক বিষাদময় অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সরকারি বা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নজরদারি এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রমই হতে পারে হারিয়ে যাওয়া এই ঐতিহ্যকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা