বৃহস্পতিবার | সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬
প্রচ্ছদ ভ্রমণ “লংগদু-নানিয়ারচর সংযোগ; অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি”

“লংগদু-নানিয়ারচর সংযোগ; অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি”

মোহাম্মদ এরশাদ আলী, লংগদু,  রাঙামাটি : পটভূমি : স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও রাঙামাটি জেলা সদরের সাথে লংগদু উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়নি। রাঙামাটি জেলার লংগদু ও নানিয়ারচর উপজেলা দুটি দূর্গম পার্বত্য অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা। বর্তমানে দুই উপজেলার মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ নেই বললেই চলে। নানিয়ারচর থেকে লংগদু পর্যন্ত স্থলপথে দূরত্ব প্রায় ৩৭ কিলোমিটার, তবে স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী কার্যকর সড়কের দৈর্ঘ্য ২৭ কিলোমিটার। প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় বাইকা ও ঘুরতে আসা পর্যটকরা বলেন, মাত্র ১৩-১৪ কিলোমিটার  রাস্তা ব্যবহারের উপযোগী হলেই এ রাস্তায় যাত্রী চলাচল করা সম্ভব হবে। বর্তমানে জেলা শহরের সাথে লংগদুর যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌপথ। যা শুষ্ক মৌসুমে লঞ্চ বন্ধ হয়ে গেলে মানুষকে  পার্শ্ববর্তী জেলার তিনটি উপজেলা হয়ে দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হয়। এতে জেলা সদরে আসতে বাইকে ৪-৫ ঘন্টা এবং বাঘাইছড়ি যেতে ৭-৮ ঘন্টা সময় লাগে।

বর্তমান অবস্থা : বর্তমানে রাস্তাটির নানিয়ারচর অংশে রাংগীপাড়া পর্যন্ত প্রায় ৫ কিমি কার্পেটিং ও ১ কিমি ব্রিক সলিং এবং লংগদু অংশে বাইট্টাপাড়া থেকে বড়াদম (দজরপাড়া) স্টিল ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় ৪ কিমি কার্পেটিং ও ৪ কিমি ব্রিক সলিং সম্পন্ন করা হয়েছে। আরো প্রায় ১৪ কিলোমিটার সড়ক আংশিকভাবে তৈরি।

রাস্তাটির কাজে মূল সমস্যা : প্রায় ১৩ কিমি অংশ নানিয়ারচরের রাঙ্গীপাড়া কালভার্ট থেকে লংগদুর বড়াদম স্টিল ব্রিজ পর্যন্ত এখনো চলাচলের অনুপযোগী। যা কতিপয় উগ্রবাদী সন্ত্রাসী চক্রের বাঁধা,  চাঁদাবাজি ভয়ভীতির কারণে বার বার বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইন্জিনিয়ারিং কোরের মাধ্যমে দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান স্থানীয়রা।

পূর্বের উদ্যোগ : সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর কাজ শুরু করলেও শেষ না করে বন্ধ করে দেয়। গত বছর স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগে লংগদু অংশের কাজ শুরু হলেও মাসখানেক পর অর্থাভাবে ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ ইউপিডিএফের বাঁধায় বন্ধ হয়ে যায়।

সরকারি ভাবে বাস্তবায়নের আশ্বাস :ইতিমধ্যে বর্তমান সরকারের স্থানীয় সাংসদ দীপেন দেওয়ান এমপি ২০২৬ সালের ২২ জুলাই লংগদু সফরে প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন। একই সময় পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী মীর হেলালও সড়কটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে মেরামত করে যান চলাচলের উপযোগী করা হবে বলে লংগদুতে ঘোষণা করেন।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহলের মতে, রাস্তাটি বাস্তবায়িত হলে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সম্ভাব্য প্রভাব ফেলবে এটি, শুধু একটি রাস্তা নয়, পুরো অঞ্চলের অর্থনীতির “চালিকাশক্তি” হয়ে উঠবে লংগদু -নানিয়ারচর সংযোগ সড়ক।

যোগাযোগে সময়ের সাশ্রয় : সড়ক চালু হলে বাঘাইছড়ি থেকে রাঙামাটি পৌঁছাতে ৩ ঘন্টা এবং লংগদু থেকে ২ ঘন্টায় জেলা শহরে যাওয়া সম্ভব হবে। বর্তমানে ৪-৮ ঘন্টার নৌপথের দুর্ভোগ পোহাতে হয়, তার সমাপ্তি ঘটবে ।

কৃষিপণ্য পরিবহন ও বাজারজাতকর : স্থানীয়দের মতে, সড়ক চালু হলে তিনটি উপজেলার উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাত সহজ হবে এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রতিফলন ঘটবে। দুর্গম অঞ্চলের ফল-মূল, সবজি ও বনজ পণ্য সরাসরি জেলা সদরসহ বাহিরের জেলাগুলোতে বাজারজাত করা যাবে।

জনসংখ্যা ও সেবা প্রাপ্তি : এই সড়কের সাথে বাঘাইছড়ির ১,০৬,২৮৭ জন এবং লংগদুর ৯০,৪০৮ জন অর্থাৎ মোট প্রায় ১,৯৬,৬৯৫ মানুষের জীবন-জীবিকা সরাসরি জড়িত। শিক্ষার্থী, রোগী ও ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রশাসনিক সেবা সহজলভ্য হবে।

পর্যটন ও ব্যবসা : চুনিলাল দেওয়ান সেতু নির্মাণের পর বগাইছড়ি-নানিয়ারচর-লংগদু সড়ক দিয়ে সাজেক যাওয়া সহজ হয়েছে। লংগদু-নানিয়ারচর সংযোগ হলে রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি পর্যটন সার্কিট আরও শক্তিশালী হবে। এছাড়া রাঙামাটিতে ১৫ বছরে ১০ কোটি টাকা সড়ক উন্নয়নে ব্যয় হয়েছে যা পর্যটন ও যোগাযোগে বড় ভূমিকা রাখছে।

চ্যালেঞ্জ ও উদ্বেগ : পরিবেশগত উদ্বেগ : নানিয়ারচরের কিছু স্থানীয় সংগঠন “বন ও পরিবেশ রক্ষা কমিটি”র ব্যানারে সড়ক নির্মাণের বিরোধিতা করেছে। তাদের মতে, বন উজাড়, ফসলি জমি নষ্ট ও পানি সংকট বাড়বে। তারা প্রকল্প বাতিলের দাবি জানিয়েছে।

ধীরগতি ও বাধা : দীর্ঘদিন ধরে কাজ ধীরগতিতে চলায় মানববন্ধনও হয়েছে। নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক কারণেও কাজ বারবার বন্ধ হয়েছে। তাছাড়া বার বার কাজ শুরুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও কিছু সন্ত্রাসী চক্রের বাঁধা মুখে বন্ধ হয়ে যায়।

শিক্ষা ব্যবস্থা অগ্রগতি : রাস্তাটি চালু হলে শিক্ষা দীক্ষায় আমূল পরিবর্তন ঘটবে উপজেলাটির। জেলা সদরের সাথে যোগাযোগ কঠিন হওয়ায় শিক্ষার হার তুলনামূলক কম, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছুটা উন্নতি হচ্ছে।

লংগদু উপজেলায় একটি সরকারি ডিগ্রী কলেজ, দুটি বেসরকারি কলেজ একটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়সহ ১৪টি বেসরকারি উচ্চ বিদ্যলয় ও ৮৬ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ২১টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে।

এছাড়াও তিনটি দাখিল ও একটি ফাজিল মাদ্রাসা সহ ১৩ টি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা এবং বেশ কিছু নূরানী ও ফোরকানীয়া হেফজখনা চালু রয়েছে। বর্তমানে এলাকার প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বর্ষায় ও শুষ্ক মৌসুমে নৌপথ বন্ধ থাকলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যায়। যোগাযোগ কষ্টকর হওয়ার সরকারি চাকুরীজীবিরাও বদলী হয়ে অন্যত্র চলে যান। নানিয়ারচর-লংগদু সড়ক হলে শিক্ষা উপকরণ পরিবহন ও শিক্ষক- শিক্ষার্থীদের যাতায়াত, উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ ও সুশিক্ষা লাভে সহজ হবে।

উপসংহার : লংগদু-নানিয়ারচর সংযোগ সড়কের শুধু ২৭-৩৭ কি.মি. পাঁকা রাস্তা নয়। এটি প্রায় ২ লাখ মানুষের স্বপ্ন এবং পার্বত্য রাঙামাটির অর্থনৈতিক মুক্তির চাবিকাটি। সড়কটি চালু হলে যোগাযোগ, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পর্যটন সব খাতে গুণগত পরিবর্তন আসবে এবং এলাকাটি অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী অঞ্চলে পরিণত হবে।

এমতাবস্থায়, সরকারের দ্রুত উদ্যোগ এবং স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় পরিবেশ রক্ষা করে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেলে এটি হবে পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের একটি মাইলফলক। লংগদু উপজেলার উন্নয়নের চালিকাশক্তি।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা