ডিমলা (নীলফামারী) থেকে মহিনুল ইসলাম সুজন : প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে প্রায় চার বিঘা সরকারি জমির ওপর নির্মিত মিনি পার্ক হিসেবে পরিচিত ‘বিজয় চত্বর’ এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। একসময় সীমান্তবর্তী এই উপজেলার সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিশেষ করে শিশুদের বিনোদন ও মানসিক প্রশান্তির অন্যতম স্থান ছিল এটি। পাশাপাশি রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের জন্যও বিজয় চত্বর ছিল উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
বিজয় চত্বরে রয়েছে সুবিশাল শহীদ মিনার, শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল, মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ, বসার জন্য স্টিল ও সিমেন্টের বেঞ্চ, নারী-পুরুষের পৃথক শৌচাগার, হাঁটাচলার পথ, এলইডি লাইটিং এবং শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য দোলনা, স্লিপার, ক্লাইম্বিং ডোম ও দুই আসনের স্প্রিং লোডেডসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম। রয়েছে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও।
নান্দনিক এই চত্বরটি নির্মাণের পর স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ এটি দেখতে আসতেন। অবসর পেলেই অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে এখানে ঘুরতে আসতেন। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার পর থেকে চত্বরটির অবস্থা অত্যন্ত করুণ হয়ে পড়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
জানা যায়, ২০২২ সালের ২১ মার্চ দুপুরে নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব আফতাব উদ্দিন সরকারের আহ্বানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন শফিক প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বিজয় চত্বরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
তবে কোন সরকার বা কার উদ্যোগে স্থাপনাটি নির্মাণ ও উদ্বোধন করা হয়েছে—এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ভিন্ন রাজনৈতিক মত রয়েছে। স্থানীয়দের বক্তব্য, নির্মাণে ব্যয় হয়েছে রাষ্ট্রীয় অর্থ, অর্থাৎ জনগণের অর্থ। তাই বিজয় চত্বরকে কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের সম্পদ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ও জনসাধারণের সম্পদ হিসেবে দেখেন তারা।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের দিন বিক্ষুব্ধ জনতার হামলা ও ভাঙচুরে চত্বরটির বিভিন্ন স্থাপনা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ সময় শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরালসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। প্রাচীরের একাধিক স্টিলের গেট, ফ্যান, লাইট, আসবাবপত্র, লাইব্রেরির বই, গ্রিল, দরজা-জানালা, ডাস্টবিনসহ বিভিন্ন মালামাল খুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
বর্তমানে চত্বরের বৈদ্যুতিক পিলারগুলো থাকলেও আগের মতো সবগুলোতে আলো জ্বলে না।
একসময় আলোকসজ্জায় সজ্জিত থাকা বিজয় চত্বর এখন অনেকটাই অন্ধকারাচ্ছন্ন। শিশুদের খেলার একটি দোলনা ভেঙে পড়ে আছে। দুই আসনের স্প্রিং লোডেডের এক পাশ ভাঙা। ক্লাইম্বিং ডোমের নিচে জমে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা। স্লিপারগুলোতে ধরেছে মরিচা। নেই ডাস্টবিনও। শৌচাগারগুলোও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পুরো চত্বরজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে একসময়ের প্রাণবন্ত বিজয় চত্বর ধীরে ধীরে অনিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে। সেখানে কিশোরদের আড্ডা, মাদকসেবীদের আনাগোনা, ধূমপান এবং বখাটেদের আড্ডা বেড়েছে বলেও অভিযোগ তাদের। পাশাপাশি চত্বরের বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা এবং মলমূত্র ত্যাগের অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনাটি বেহাল অবস্থায় থাকলেও সংস্কার, পরিচ্ছন্নতা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। ফলে ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে সরকারি অর্থে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ এই মিনি পার্কটি।
শিশু সন্তানকে নিয়ে বিজয় চত্বরে ঘুরতে আসা ফরিদা নামে এক শিক্ষিকা বলেন, “আগে একটু সময় পেলেই পরিবার নিয়ে এখানে ঘুরতে আসতাম। এখন আর তেমন আসা হয় না। এখানে আগের মতো পরিবেশ নেই। চারদিকে আবর্জনা, প্রস্রাবের দুর্গন্ধ এবং বখাটে ছেলেদের প্রকাশ্যে ধূমপান করতে দেখা যায়। আমার সন্তান মনে করেছে বিজয় চত্বর আগের মতোই রয়েছে। তাই তার বায়নায় বাধ্য হয়ে তাকে এখানে নিয়ে এসেছি।
শামীম নামে এক সরকারি চাকরিজীবী বলেন, “সন্তান বিজয় চত্বরে আসার জন্য বাড়িতে কান্নাকাটি করছিল। তাই তাকে একাই ঘুরতে নিয়ে এসেছি। আগে পরিবেশ অনেক ভালো ছিল। তখন সন্তানের সঙ্গে তার মাকেও নিয়ে আসতাম। এখন সেই পরিবেশ নেই।”
স্থানীয় বাসিন্দাদেরও একই ধরনের অভিযোগ।
বিজয় চত্বরের সামনের ভাতের হোটেল মালিক জলিল, আইসক্রিম-ভ্যারাইটিস স্টোরের মালিক রহিম, ফুচকা-চটপটি বিক্রেতা অনিল, ফটোকপি-কম্পিউটার ব্যবসায়ী ওয়াসীম এবং মোবাইল-বিকাশ ব্যবসায়ী খোকন বলেন, “আগে অনেক মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে বিজয় চত্বরে ঘুরতে আসতেন। তখন আমাদের বেচাকেনাও ভালো হতো। এখন খুব বেশি মানুষ পরিবার নিয়ে এখানে আসে না। কারণ আগের মতো পরিবেশ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নেই। অন্যের কথা বাদই দিলাম, আমরাই এখন আমাদের পরিবারকে এখানে নিয়ে আসি না।
তারা আরও বলেন, “আমরা চাই বিজয় চত্বরের আগের পরিবেশ ফিরে আসুক। এটা কারও ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, দেশের সম্পদ—আমাদের সবার, অর্থাৎ জনগণের সম্পদ।
স্থানীয়রা দ্রুত বিজয় চত্বরের ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা সংস্কার, বৈদ্যুতিক আলোকসজ্জা পুনঃস্থাপন, শিশুদের খেলাধুলার সরঞ্জাম মেরামত, শৌচাগারগুলো ব্যবহার উপযোগী করা এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে চত্বরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি তাদের।
স্থানীয়দের মতে, কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই জনসম্পদকে অবহেলায় নষ্ট হতে দেওয়া হলে শুধু একটি বিনোদনকেন্দ্রই হারাবে না; জনগণের অর্থে গড়ে ওঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও ধ্বংসের মুখে পড়বে।
ডিমলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফুল ইসলাম বলেন, “বিজয় চত্বরে পরপর আমি দুবার সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে অভিযান চালিয়েছি। তবে মাদকসেবীদের পাইনি। প্রয়োজন হলে আরও অভিযান চালানো হবে। মাদকসেবীদের উপস্থিতি পাওয়া গেলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরানুজ্জামান বলেন, “আমরা এলাকার পরিত্যক্ত জায়গাগুলো সংস্কারের জন্য ডিসি স্যারকে বলেছিলাম। পরিত্যক্ত জায়গার তথ্য চাওয়ায় প্রায় ছয় মাস আগে পুরো বিজয় চত্বরের ছবি তুলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি।দ্রুত কাজ হবার কথা ছিলো। একনেকে প্রকল্পগুলো পাস হয়ে গেলেই সরকার থেকে এখানে নতুন করে স্থাপনা তৈরি ও প্রয়োজনীয় সংস্কার করে দেওয়া হবে।তাই আমরা একই কাজ বার বার করে সরকারি অর্থ অপচয় করতে চাচ্ছিনা।সেন্ট্রালি প্রজেক্টটি বাস্তবায়ন করছেন।
আমরা আবারও পরিদর্শন করে আপাতত লাইটিংয়ের ব্যবস্থার পাশাপাশি ছোট-ছোট প্রজেক্টের মাধ্যমে মোটামুটি একটা অবস্থায় যাতে নিয়ে এসে দেয়া যায় সেই ব্যবস্থা করবো।
