কিশোরগঞ্জ থেকে মোঃ মিজানুর রহমান : সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অসহায় ও অসচ্ছল মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা করছেন কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রূপম দাস।
একই সঙ্গে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা পরিষদ প্রশাসক ও পৌর প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। একাধিক দায়িত্বের ব্যস্ততার মধ্যেও নাগরিক সেবা, প্রশাসনিক কাজ ও বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রমের পাশাপাশি মানুষের ব্যক্তিগত সমস্যার কথাও শুনছেন।
সম্প্রতি তাঁর কাছে সহায়তা চাইতে যান চরপাকুন্দিয়া গ্রামের নুরু মিয়া। বয়সের কারণে আগের মতো কাজ না পাওয়ায় তিনি উপজেলা পরিষদের গেটের নিচে অস্থায়ীভাবে চা বিক্রি করছিলেন। সরকারি জায়গায় দোকান বসানোর নিয়ম না থাকায় তাঁকে বিষয়টি জানানো হয়। পরে নিজের অসহায়ত্বের কথা ইউএনওকে জানান নুরু মিয়া।
নুরু মিয়ার কথা শুনে রূপম দাস তাঁকে কিছু টাকা দেওয়ার পরিবর্তে একটি ফ্লাস্ক কিনে দেন। যাতে স্থায়ীভাবে সরকারি জায়গায় দোকান না বসিয়েও ফ্লাস্কে করে চা বিক্রি করে আয় করতে পারেন তিনি। এখন সেই ফ্লাস্কে করে চা বিক্রির চেষ্টা করছেন নুরু মিয়া।
নুরু মিয়া চরপাকুন্দিয়া এলাকায় সরকার বরাদ্দ একটি ঘরে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। মানুষের কাজ করে এতদিন সংসার চালিয়েছেন। বয়স বাড়ায় কাজ কমে যাওয়ার পর জীবিকার জন্য চা বিক্রির উদ্যোগ নেন। ইউএনওর দেওয়া ফ্লাস্ক তাঁর সেই উদ্যোগ চালিয়ে যাওয়ার একটি উপায় হয়েছে।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের অনেকেই ইউএনওর উদ্যোগের প্রশংসা করেন।
রফিকুল ইসলাম পলাশ নামের একজন লিখেছেন, ‘মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন।’
শরীফুল ইসলাম নামের আরেকজন মন্তব্য করেন, ‘মানুষ মানুষের জন্য। মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে আপনার এ প্রয়াস প্রশংসার দাবিদার।’
রূপম দাসের কাছে আসা মানুষের সমস্যার ধরন অবশ্য শুধু জীবিকা সংক্রান্ত নয়। চিকিৎসা, শিক্ষা ও আর্থিক সংকট নিয়েও অনেকে তাঁর কাছে সহযোগিতা চান। প্রয়োজন অনুযায়ী তাঁদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করেন তিনি। তবে তাঁর সহযোগিতার ক্ষেত্রে সব সময় শুধু নগদ অর্থ দেওয়াই লক্ষ্য নয়; সম্ভব হলে সমস্যার অন্য কোনো সমাধানও খোঁজেন।
অর্থাভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে না পারা দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদেরও সহযোগিতা করেন রূপম দাস।
ভর্তি, পড়াশোনার খরচ ও পরীক্ষার ফি দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে সহায়তা করার নজির রয়েছে তাঁর। এমন একজন শিক্ষার্থী বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) পড়াশোনা করছেন। অর্থের কারণে যাতে পড়াশোনা বন্ধ না হয়, সে জন্য ওই শিক্ষার্থীকে নিয়মিত মাসিক খরচ পাঠান রূপম দাস। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীর অসচ্ছল মাকেও সহযোগিতা করেন তিনি।
এ ছাড়া অর্থের অভাবে উচ্চশিক্ষায় যেতে না পারা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে না পারা কিংবা ফি দিতে না পেরে পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা শিক্ষার্থীদেরও প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা করেন তিনি। অসচ্ছল পরিবারের জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থাও করেন ইউএনও।
রূপম দাস বর্তমানে ইউএনওর পাশাপাশি উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা পরিষদ প্রশাসকও পৌর প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন। এসব দায়িত্বের কারণে তাঁকে প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি ভূমি অফিস, পৌরসভার নাগরিক সেবা এবং বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রমে সময় দিতে হয়।
রূপম দাস জানান, প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা–৯টা পর্যন্ত কাজ করেন। পৌরসভার জন্মনিবন্ধন, ওয়ারিশান সনদসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবার কাজ প্রয়োজনে রাত ১২টা পর্যন্ত করেন। এর বাইরে ভূমি অফিসের কাজ, মোবাইল কোর্ট, বিভিন্ন তদন্ত ও মনিটরিং, সরকারি কর্মসূচি এবং পরিচ্ছন্নতা অভিযানেও অংশ নেন।
রূপম দাস বলেন, “আমি চাই সমাজের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে। একসঙ্গে চারটি দায়িত্ব পালন করলেও মানুষের যেন কোনো ধরনের হয়রানি না হয়, সে জন্য সাধ্যমতো সর্বোচ্চ সময় ও শ্রম দিই। প্রয়োজন হলে রাত ১২টা পর্যন্ত কাজ করি—রাষ্ট্রের অর্পিত দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে পালন করাই আমার মূল লক্ষ্য।”
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, সহায়তার জন্য আসা মানুষকে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু অর্থ দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের সমস্যা কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে কমানো যায়, সেটি বিবেচনা করার বিষয়টি ইতিবাচক। নুরু মিয়ার ক্ষেত্রে ফ্লাস্ক দেওয়ায় তিনি নিজে চা বিক্রি করে আয় করার সুযোগ পেয়েছেন।
জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন রূপম দাস। এর আগে তিনি রাজশাহীতে সিনিয়র সহকারী কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ৩৭তম বিসিএসের একজন কর্মকর্তা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণীবিজ্ঞানে স্নাতক এবং জেনেটিক্স অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন তিনি। তাঁর নিজ জেলা জয়পুরহাট।
দাপ্তরিক দায়িত্বের পাশাপাশি মানুষের ব্যক্তিগত সমস্যা ও প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সহযোগিতার এসব উদ্যোগের কারণে স্থানীয়দের মধ্যে তাঁর কাজ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
