মঙ্গলবার | সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ পটিয়ার চানখালী খালের ওপর শতবর্ষী মরণফাঁদ

টাঙ্গারপুল নতুন সেতুর স্বপ্ন

পটিয়ার চানখালী খালের ওপর শতবর্ষী মরণফাঁদ

পটিয়া (চট্টগ্রাম) থেকে সেলিম চৌধুরী : দুই প্রান্তে ভাঙা সড়ক, নিচে খরস্রোতা চানখালী খাল। সেতুতে ওঠার পথটুকুও কোনো কোনো জায়গায় নেই, বাঁশের সাঁকো বেয়ে উঠতে হয় নড়বড়ে ঝুকিপূর্ণ সেতুতে। শতবর্ষের পুরোনো টাঙ্গারপুল সেতুর ওপর দিয়ে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পার হচ্ছেন পটিয়া ও আনোয়ারার হাজারো মানুষ। স্কুলশিক্ষার্থী থেকে কৃষক, রোগী থেকে ব্যবসায়ী সবারই নিত্যদিনের যোগাযোগের প্রধান এই সেতুটি এখন যেন একটি ‘মরণফাঁদথ। ভারী যানবাহন তো দূরের কথা, নড়বড়ে ও সরু সেতু দিয়ে মোটরসাইকেল চলাচলও অনেকটা অসম্ভব। বর্ষায় খালের স্রোত বাড়লে বাড়ে আতঙ্কও।

সরেজমিনে দেখা যায়, এক পাশে পটিয়ার আশিয়া ইউনিয়ন, অন্য পাশে আনোয়ারার পরৈকোড়া ইউনিয়ন। মাঝখানে খরস্রোতা চানখালী খাল। দুই উপজেলার মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগের একমাত্র ভরসা শতবর্ষী টাঙ্গারপুল সেতু। সময়ের ভারে জীর্ণ সেতুটির দুই প্রান্তের সংযোগ সড়ক ভেঙে খালে বিলীন হয়েছে। কোথাও বাঁশের সাঁকো, কোথাও জোড়াতালি এভাবেই ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করছেন হাজারো মানুষ। এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাব পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট একটি বিশেষজ্ঞ দল সেতুটির স্থান সরেজমিনে পরিদর্শন করেছে। তারা সেতুর অবস্থান, সংযোগ সড়ক, আশপাশের যোগাযোগব্যবস্থা, সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব এবং নতুন সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে।

পটিয়া উপজেলা প্রকৌশলী তন্ময় নাথ বলেন, টাঙ্গারপুল সেতুটিকে দীর্ঘ সেতু নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় নেওয়ার জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ‘এলজিইডির পল্লী সড়কে গুরুত্বপূর্ন সেতু নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্প-(২য় সংশোধিত ) এর আওতায় টাঙ্গারপুল সেতুটিকে প্রস্তাবিত ৯৯ মিটার দৈঘের্য উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্প প্রস্তাবটি এলজিইডির সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়া এগিয়ে গেলে সেতুটির উন্নয়ন বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে।

এলজিইডির এই কর্মকর্তা আরও জানান, প্রস্তাব পাঠানোর আগে সেতুর স্থান সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়েছে। সেতুটির অবস্থান, সংযোগ সড়ক ও সম্ভাব্য নির্মাণকাজের বিভিন্ন দিক বিবেচনা করেই প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে।স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চানখালী খালের ওপর নির্মিত টাঙ্গারপুল সেতুটির বয়স প্রায় একশ বছর। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সেতুটি এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। সেতুর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের অংশ ভেঙে গেছে। সংযোগ সড়কের বড় একটি অংশ খরস্রোতা খালে বিলীন হয়েছে। কোথাও সেতুতে ওঠার জন্য বাঁশের সাঁকোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সেতুর গার্ডার ও বিভিন্ন অংশও নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের। সেতুর পশ্চিম প্রান্তে আনোয়ারা উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের মাহাতা, দীঘিরপাড়সহ কয়েকটি গ্রাম। পূর্ব প্রান্তে রয়েছে পটিয়ার আশিয়া ইউনিয়নের বাথুয়া এলাকা। দুই প্রান্তেই রয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, কমিউনিটি ক্লিনিক ও বাজার। ফলে সেতুটি শুধু দুই উপজেলার সংযোগ নয়, কয়েকটি গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রারও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।

সেতুটির দুই পাড়ের স্থানীয়দের অভিযোগ, সেতুটি নড়বড়ে হয়ে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ। আগে কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন মালামাল সহজে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নেওয়া গেলেও এখন তা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কৃষকদের অনেকটা ঘুরে হাটবাজারে পণ্য নিয়ে যেতে হচ্ছে। এতে সময় ও পরিবহন খরচ দুটোই বাড়ছে।

আশিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা জাবেদ চৌধুরী বলেন, টাঙ্গারপুল সেতুটি উন্নত হলে পটিয়া ও আনোয়ারার মধ্যে যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হবে। বর্তমানে সেতুটির কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন কৃষক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। নতুন সেতু হলে এ এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে।

এদিকে, বর্ষা মৌসুমে দুর্ভোগ আরও বাড়ে। চানখালী খালে পানি ও স্রোত বেড়ে গেলে ভাঙা সংযোগ অংশ দিয়ে পারাপার আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। তারপরও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়েই মানুষ সেতুটি ব্যবহার করছেন।

স্থানীয়রা জানান, জরুরি রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত কিংবা কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়ার ক্ষেত্রে সেতুটির ওপর নির্ভর করতে হয়। সেতুটি পুরোপুরি ধসে পড়লে দুই উপজেলার কয়েক হাজার মানুষের যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

টাঙ্গারপুল সেতু নিয়ে নতুন করে উদ্যোগ অবশ্য এবারই প্রথম নয়। গত বছরের জুনের মাঝামাঝি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি অ্যান্ড প্রিপারেশন অব সাসটেইনেবল অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টথ-এর অধীনে কর্মরত জুনিয়র সামাজিক সুরক্ষা বিশেষজ্ঞদের একটি প্রতিনিধি দল টাঙ্গাপুল এলাকা পরিদর্শন করে। তৎকালীন উপজেলা প্রকৌশলী কমল কান্তি পালের নেতৃত্বে পরিদর্শনে আসা তিন সদস্যের প্রতিনিধি দলে ছিলেন মো. কবিরুল ইসলাম, মুক্তা সাহা রায় ও রবিউল ইসলাম। পরিদর্শনের সময় তারা টাঙ্গাপুল সেতু ও আশপাশের এলাকার সামাজিক ও পরিবেশগত প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করেন। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের মতামত ও প্রত্যাশা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। দুর্গম ও অনুন্নত এলাকার গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘প্রোগ্রাম ফর সাপোর্টিং রুরাল ব্রিজথ-এর আওতায় নতুন সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতাও যাচাই করা হয়। সে সময় বিশেষজ্ঞ দলের পর্যেবক্ষণে উঠে আসে, টাঙ্গাপুল সেতুটি পটিয়ার আশিয়া ও আনোয়ারার পরৈকোড়া ইউনিয়নের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপনকারী গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ হাটবাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসাসেবার জন্য এ সেতু ব্যবহার করেন।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা