কক্সবাজার থেকে রিয়াজ উদ্দিন : কক্সবাজারের রামুতে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি নাগরিক সাজিয়ে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে পাওয়া বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করে রামু উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের ঠিকানা ব্যবহার করে অন্তত ১২ জনের নতুন ভোটার হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
নথিতে এসব ব্যক্তির বয়স ২২ থেকে ৬৬ বছরের মধ্যে। তাঁদের মধ্যে ৬৬, ৪৪, ৪৩ ও ৪১ বছর বয়সী ব্যক্তিও রয়েছেন। তবে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধিদের দাবি, ভোটার তালিকায় স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে উল্লেখ থাকা এসব ব্যক্তির কাউকেই তারা চেনেন না।
নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, রামুর খুনিয়াপালং, দক্ষিণ মিঠাছড়ি, ঈদগড় ও গর্জনিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডের ঠিকানা ব্যবহার করে তাঁদের ভোটার করা হয়েছে।
খুনিয়াপালংয়ের পেঁচারদ্বীপের বাসিন্দা হিসেবে নুর হোসাইন (৬৬) এবং দক্ষিণ মিঠাছড়ির বলিপাড়ার ঠিকানা ব্যবহার করে ফাতেমা বেগম (৪৪)-এর নাম পাওয়া গেছে। একই ইউনিয়নের মোক্তার বাপেরপাড়ার ঠিকানায় ইসমত আরা সুলতানা (২৬), পূর্ব পানেরছড়ার ঠিকানায় ফয়সাল (২৬) ও সিরাজুল মোস্তাফা (২২)-এর নাম রয়েছে।
এ ছাড়া ঈদগড় ইউনিয়নের করলিয়ামোরার ঠিকানা ব্যবহার করে মুনতাহা (২৫) ও রবিদা (৪১), ছগিরাকাটার ঠিকানায় খালেদা আক্তার (২৮) ও রফিক (২৩), চরপাড়ার ঠিকানায় রবিদা (৪১) এবং নয়া পাড়ার ঠিকানায় রেহেনা হেলাল (৪৩)-এর নাম পাওয়া গেছে। গর্জনিয়ার ফকিরপাড়ার বাসিন্দা হিসেবে জাবের (৩২)-এর নামও নথিতে রয়েছে।
ঈদগড় ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন সিকদার এবং স্থানীয় ইউপি সদস্য রাজা মিয়া, শফিকুল ইসলাম সোহেল ও শাকের আহমদ বলেন, ভোটার তালিকায় যাদের নাম দেখা গেছে, তাঁদের কাউকেই তারা চেনেন না। এমনকি তাঁদের আগে কখনো দেখেননি বলেও দাবি করেন তাঁরা।
জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের স্থানীয় বাসিন্দা পরিচয়ে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কার্যালয়ের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ কেউ অর্থের বিনিময়ে যোগসাজশ করে থাকতে পারেন বলেও তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, রামুতে অবৈধ পন্থায় প্রতিবছর শত শত রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি ভোটার করার প্রক্রিয়া চলছে। একজনকে ভোটার বানাতে এক থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় বলেও দাবি সূত্রগুলোর। এ অর্থের একটি অংশ নির্বাচন কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সূত্রগুলোর অভিযোগ, রামু উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ের অফিস সহায়ক নুর মোহাম্মদ এ প্রক্রিয়ার সমন্বয় করেন। আবেদনকারী সংগ্রহ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি এবং ভোটার নিবন্ধনের বিভিন্ন ধাপে তাঁর ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নুর মোহাম্মদ।
স্থানীয়দের দাবি, সন্দেহজনক এসব ভোটারের জন্মনিবন্ধন, নাগরিকত্ব সনদ, বাবা-মায়ের পরিচয়, স্থায়ী ঠিকানা এবং সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের প্রত্যয়নপত্র পুনরায় যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগের সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত থাকলে তাঁদেরও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
রামু উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক খালেদ শহীদ বলেন, রোহিঙ্গাদের ভোটার করা জাতীয় নিরাপত্তা, নির্বাচনি স্বচ্ছতা ও দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। অর্থের বিনিময়ে যারা তাদের নাগরিক সুবিধা পাইয়ে দিচ্ছেন, তাঁদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে রামু উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিল্লুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়ার বিষয়টি তিনি অবগত হয়েছেন। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
