সোমবার | অক্টোবর ৫, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ ৭ হাজার একর প্যারাবন ধ্বংসের আশঙ্কা, ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ জীববৈচিত্র্য

৭ হাজার একর প্যারাবন ধ্বংসের আশঙ্কা, ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ জীববৈচিত্র্য

ককসবাজার থেকে এইচ এন আলম : কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়া দ্বীপে ম্যানগ্রোভ (প্যারাবন) কেটে গড়ে তোলা অবৈধ চিংড়িঘের উচ্ছেদে নৌবাহিনীকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দেওয়ার পর এ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ‘স্ট্রেনদেনিং ক্যাপাসিটি অব এমওইএফসিসি, ডিওই অ্যান্ড বিএফডি ফর ন্যাচারাল রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইমপ্রুভড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স’ প্রকল্পের আওতায় সোনাদিয়ায় অবৈধ দখল উচ্ছেদে নৌবাহিনীকে সম্পৃক্ত করা হবে। গত ৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী এ-সংক্রান্ত প্রস্তাবে অনুমোদন দেন।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা খানম বলেন, সোনাদিয়া দ্বীপের অবৈধ দখল উচ্ছেদে নৌবাহিনীকে সম্পৃক্ত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সম্মতি দিয়েছেন।

দ্বীপটিকে দখলমুক্ত করে এর জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনতে সর্বাত্মক উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ম্যানগ্রোভ বনের ভেতর দিয়ে ছোট ছোট খালের মাধ্যমে জোয়ার-ভাটার পানি প্রবেশ করে। এ প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দিলে বনের বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দখলদারেরা খালের মুখে বাঁধ দিয়ে পানি চলাচল বন্ধ করে বন কেটে চিংড়িঘের তৈরি করছে। ফলে প্যারাবনের বড় একটি অংশ ধ্বংস হচ্ছে।

২০০৬ সালে পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনায় সোনাদিয়া দ্বীপকে প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়। ইসিএ এলাকায় পরিবেশের ক্ষতি হয়—এমন কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ। এরপরও সেখানে প্যারাবন কেটে চিংড়িঘের গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে।

২০১৭ সালে ইকোট্যুরিজম পার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সোনাদিয়ার ৯ হাজার ৪৬৬ দশমিক ৯৩ একর বনভূমি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) কাছে বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে সেখানে প্রত্যাশিত ইকোট্যুরিজম কার্যক্রম শুরু হয়নি। বন বিভাগের আইনগত কর্তৃত্ব কমে যাওয়ার পর প্যারাবন দখলের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। বন বিভাগের হিসাবে, দ্বীপটির অন্তত ৭ হাজার একর প্যারাবন কেটে ফেলা হয়েছে।

পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০২৫ সালের মার্চে সোনাদিয়ার বনভূমি বন বিভাগের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ইতোমধ্যে তিনটি মৌজার প্রায় ৮ হাজার ৪৫ একর বনভূমি বন বিভাগের কাছে ফেরত এসেছে। তবে বেজার অধীনে এখনো ছয়টি মৌজায় প্রায় ১২ হাজার ২৭০ একর বনভূমি রয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ফাহমিদা হক খান জানান, সশস্ত্র বাহিনীকে সম্পৃক্ত করে অভিযান পরিচালনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পাওয়া গেছে। এ মাসে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, নৌবাহিনী ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ওই বৈঠকে উচ্ছেদ অভিযানের কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হবে।

তিনি জানান, অভিযানে নৌবাহিনীর প্রায় চার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। তবে প্রকল্পের আওতায় উচ্ছেদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে দুই কোটি টাকা।
এদিকে ২০২৫ সালে মহেশখালী উপজেলা প্রশাসনের এক জরিপে সোনাদিয়ায় প্রায় ৪৫ কিলোমিটার বাঁধের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এসব বাঁধ উচ্ছেদে প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল। একই বছর উপজেলা প্রশাসন ১১টি অবৈধ চিংড়িঘের উচ্ছেদ করে।

সোনাদিয়ায় সরেজমিনে দেখা গেছে, প্যারাবনের ভেতরের ছোট ছোট খালের মুখ বাঁধ দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কেটে ফেলা হয়েছে অসংখ্য বাইনগাছসহ বিভিন্ন ধরনের ম্যানগ্রোভ গাছ। বনের বিভিন্ন স্থানে পড়ে আছে কাটা গাছের গুঁড়ি। প্যারাবনের বড় অংশ দখল করে তৈরি করা হয়েছে চিংড়িঘের।

সোনাদিয়া বিট কর্মকর্তা আলাউদ্দিন আল আজাদ বলেন, প্যারাবন দখলে বাধা দিতে গেলে বন বিভাগের কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। মাত্র ছয়জন জনবল নিয়ে শত শত দখলদারের বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে অভিযান পরিচালনা করা কঠিন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) নেতারা বলছেন, শুধু অবৈধ দখল উচ্ছেদ করলেই হবে না; উচ্ছেদের পর সোনাদিয়ার জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার ও জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পুনরায় যাতে সেখানে চিংড়িঘের গড়ে উঠতে না পারে, সে জন্য বন বিভাগকে শক্তিশালী করে স্থায়ী নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা