পিরোজপুর থেকে এস,এম সিপার : পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বৈঠাকাটার ভাসমান হাটে ক্রয়-বিক্রয় সবই চলে নৌকায়। এ দৃশ্য দেখে যে কারো মনে হতে পারে এটি থাইল্যান্ড কিংবা ভিয়েতনামের কোনো ফ্লোটিং মার্কেট। বেলুয়া নদীর বুকে গড়ে ওঠা ভাসমান নৌকার দোকানের এহাটে চার ঘণ্টায় বেচাবিক্রি হয় প্রায় কোটি টাকার।শত শত নৌকা আর ক্রেতা বিক্রেতার ভিড়। উপর থেকে দেখে মনে হয় নদীর বুকে ছোটো একটা গ্রাম।

চার ঘন্টায় নৌকায় নৌকায় বেচাবিক্রি কোটি টাকা
পূবাকাশে সূর্যের আলো ফোটার আগেই সারি সারি নৌকার এ দৃশ্য যে কারো নজর কাড়ে। এখানকার মানুষ পরম যত্নে উৎপাদন করেন বিভিন্ন প্রকার ফসল ও সবজি। যা নৌকায় করে ভোরের সূর্যের আলো ফোটার আগেই নিয়ে যান ভাসমান হাটে। এখানে যেমন বিক্রি হয় টাটকা সবজি, তেমনি হয় সবজির চারাও। হাটে পাবেন তৃপ্তিদায়ক মিষ্টি, পান থেকে সকালের নাস্তা। এমনকি ভাতও পাবেন ক্ষুধা নিবারনে।
ভৌগোলিক কারনে এখানকার সর্বজনীন বাহন হচ্ছে নৌকা। আশে পাশের মানুষ সবজি আর নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি করতে হাটে আসেন নৌকা করে, ঠিক তেমনি ক্রেতারাও কিনতে আসেন নৌকা নিয়ে। কোনো নৌকায় শাকসবজি, কোনো নৌকায় ধান-চাল, আবার কোনো নৌকায় আখসহ নানা কৃষিপণ্য। একেকটি নৌকা যেন হয়ে ওঠে একেকটি ভাসমান দোকান। নৌকা থেকে নৌকায় চলে দরদাম ও কেনাবেচা। কয়েক ঘণ্টার জন্য নদীর বুকে গড়ে ওঠে জমজমাট এক বাজার।
ভাসমান এ বাজার বসে পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বৈঠাকাটা বাজারসংলগ্ন বেলুয়া নদীতে। সপ্তাহে দুই দিন বসে ব্যতিক্রমী এ হাট। জলকেন্দ্রিক বাজার ও নদী-নৌকানির্ভর জীবনযাত্রার সঙ্গে ইতালির ভেনিস শহরের জলপথকেন্দ্রিক জীবনের মিল খুঁজে পান স্থানীয়রা। এ কারণে বৈঠাকাটা বাজারকে কেউ কেউ ‘বাংলার ভেনিস’ বলেন।
দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বড় ভাসমান বাজার হিসেবে পরিচিত বৈঠাকাটা বাজারটি পিরোজপুরের নাজিরপুর ও নেছারাবাদ এবং বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার মানুষের বাণিজ্যিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। নাজিরপুর উপজেলার অংশে বেলুয়া নদীর প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বসে এ বাজার।
নাজিরপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ বাজারে ভোর থেকেই আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পাইকাররা নৌকা নিয়ে আসেন।
শনিবার ও মঙ্গলবার ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় কেনাবেচা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমে ওঠে বাজার। দ্রুতই চলে বেচাকেনা। তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যে কেনাবেচা শেষ করে বেলা ১১টার মধ্যে অধিকাংশ নৌকা ফিরে যেতে শুরু করে।
এরপর ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে নদীর বুক।
নাজিরপুর উপজেলার কলারদোয়ানিয়া, মুগারঝোর, মনোহরপুর, পদ্মডুবি, বিলডুমুরিয়া, সোনাপুর, গাওখালী, চাঁদকাঠি, সাচিয়া, লড়া ও পেনাখালীসহ বিভিন্ন গ্রামের কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য নৌকায় করে নিয়ে আসেন এ হাটে। একইভাবে নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া, গগন, মলুহার, কাঁটাখালী, ইলুহার ও জনতা এবং বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার বিশারকান্দি, উমারেরপাড়, উদয়কাঠী, কদমবাড়ি ও চৌমোহনাসহ আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের কৃষকেরাও এখানে পণ্য বিক্রি করেন।
এ ভাসমান বাজারে বরবটি, কুমড়া, পুঁইশাক, করলা, পটল, কাঁকরোল, কাঁচকলা, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ, শালগম, কচু, চালকুমড়া, নারিকেল, কলা, শাপলা, সবজির চারা ও বিভিন্ন কৃষিপণ্যের ব্যাপক সমারোহ ঘটে। কাকডাকা ভোরে ডিঙি নৌকায় কৃষিপণ্যের পসরা সাজিয়ে বাজারে আসেন কৃষকেরা। একই সময়ে ক্রেতা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও জড়ো হন।
শুধু কৃষিপণ্য নয়, বাজারটিতে রয়েছে ভাসমান চায়ের দোকান, পিঠা ও বিভিন্ন খাবারের দোকানও। নৌকাতেই এসব দোকানের পসরা সাজিয়ে বিক্রি করেন বিক্রেতারা। ফলে কয়েক ঘণ্টার জন্য বেলুয়া নদী পরিণত হয় মানুষের কোলাহল ও বেচাকেনায় মুখর এক ব্যতিক্রমী বাজারে।
বৈঠাকাটা বাজারে স্থানীয় কৃষকের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও পাইকাররা আসেন। তারা কৃষিপণ্য কিনে আশপাশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা বাজারে নিয়ে যান। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখানকার কৃষিপণ্যের একটি অংশ দেশের বাইরেও যায়।
এ বাজারের অন্যতম বিশেষ দিক হলো ভাসমান কৃষির উপকরণের বেচাকেনা। বেলুয়া নদীতে শুধু শাকসবজি বা ফলমূল নয়, বিক্রি হয় বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ ও আগাছাও। এসব উদ্ভিদ ব্যবহার করে ভাসমান বেড তৈরি করে শীতকালীন সবজি ও সবজির চারা উৎপাদন করেন স্থানীয় কৃষকেরা।
দক্ষিণাঞ্চলের খাল-বিল ও ছোট নদীবেষ্টিত এলাকায় পানির ওপর ভাসমান বেডে সবজি চাষের প্রচলন দীর্ঘদিনের। কচুরিপানা, তেঁপাপোনা, দুলালিলতা, ফেনাসহ বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ ব্যবহার করে তৈরি করা হয় এসব ভাসমান বেড। বৈঠাকাটা বাজারের অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি রয়েছে পর্যটনের সম্ভাবনাও। দেশের বাইরের বিভিন্ন জায়গা থেকেও মানুষ এখানে ঘুরতে আসেন। নদীর বুকজুড়ে শত শত নৌকা, কৃষিপণ্যের বেচাকেনা, স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা ও নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতি সব মিলিয়ে এটি দক্ষিণাঞ্চলের একটি আকর্ষণীয় গ্রামীণ পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতি হাটে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ লাখ টাকার পণ্য কেনাবেচা হয়। তবে মৌসুমভেদে বাজারের চিত্র বদলে যায়। বিশেষ করে তরমুজের মৌসুমে নদীর বুকজুড়ে দেখা যায় তরমুজবোঝাই নৌকার সারি। তখন প্রতি হাটে কেনাবেচার পরিমাণ এক থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছায় বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী শাহাবুদ্দিন জানান, আমি গ্রাম থেকে মাল কিনে এনে এখানে বিক্রি করি। বেশিরভাগ সময় পেঁপে বিক্রি করি। এই বাজারে বেচাকেনা ভালো হয়, দামও ভালো পাই। এখানকার আয় দিয়েই পরিবার ভালোভাবে চালাচ্ছি। আরেক ব্যবসায়ী সন্তোষ বৈরাগী বলেন, শনিবার ও মঙ্গলবার ভোরে বাজার শুরু হয়ে সকাল ১০টা পর্যন্ত চলে। এই বাজারের প্রধান পণ্য কাঁচা সবজি, নারিকেল ও তরমুজ। সব মিলিয়ে ভালো বেচাকেনা হয়। তরমুজের মৌসুমে প্রতিদিন এক থেকে দেড় কোটি টাকার মতো বেচাকেনা হয়। বর্তমানে এই বাজারে ৫০ থেকে ৭০ লাখ টাকার বেচাকেনা হয়।
বৈঠাকাটা বাজারে জলজ উদ্ভিদ বিক্রি করতে আসা জুলহাস গাজী বলেন, আমি এ বাজারে দুলালিলতা নিয়ে আসি। বেচাকেনা মোটামুটি ভালো। দিনে আট-নয় হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়, বাজার খারাপ গেলে পাঁচ হাজার টাকার মতো হয়।
দুলালিলতা ও শ্যাওলা কিনতে আসা আজিবর নামের এক ক্রেতা বলেন, ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনের জন্য শ্যাওলা ও দুলালিলতা কিনতে বাজারে এসেছি। এগুলো দিয়ে ভাসমান বেড তৈরি করে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও চারা উৎপাদন করা হয়।
এ অঞ্চলে পানিতে ডুবে থাকা জমিতে ভাসমান ধাপ তৈরি করে কৃষকেরা সবজি ও চারা উৎপাদন করেন। পরে নৌপথে এসব পণ্য পৌঁছে যায় বৈঠাকাটা বাজারে। অর্থাৎ কৃষি উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পুরো প্রক্রিয়াটিই অনেকটা নদী ও নৌকাকেন্দ্রিক।
বাজারটি ঠিক কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা সুনির্দিষ্টভাবে কেউ বলতে পারেন না। স্থানীয়দের ধারণা, বাজারটির বয়স এক শতাব্দীর কম নয়।
প্রায় চার দশক ধরে বৈঠাকাটা বাজারে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রফিকুল বলেন, ১৯৭১ সালে আমার জন্ম। এর আগে থেকেই এই হাট ছিল। আমার ধারণা, হাটটির বয়স ৭০ থেকে ৭৫ বছর হবে।
স্থানীয় এক ব্যাবসায়ী হাতেম আলী বলেন, যুগ যুগ ধরে এই হাট চলে আসছে। আমার বাবা-দাদার আমল থেকেই এখানে এভাবে বেচাকেনা হতে দেখেছি। এখানে শাকসবজি, চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া ও নানা ধরনের কৃষিপণ্য পাওয়া যায়। দূর-দূরান্তের ব্যবসায়ীরাও এখানে পণ্য কিনতে আসেন।
বাজারের বয়স নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে মতভেদ থাকলেও একটি বিষয়ে সবাই একমত—দীর্ঘদিন ধরে বৈঠাকাটা বাজার এ অঞ্চলের কৃষি ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে টিকে আছে।
নাজিরপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারন কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান মিল্টন বলেন, তিনটি উপজেলার মিলনস্থল হওয়ায় ভৌগোলিকভাবে বৈঠাকাটা ভাসমান বাজার গুরুত্বপূর্ণ যা একইসঙ্গে নাজিরপুর উপজেলার ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনকে যেমন টিকিয়ে রেখেছে শত শত বছরের ঐতিহ্য হিসেবে, অন্যদিকে নেছারাবাদকে গড়ে তুলেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ নার্সারি পয়েন্ট রূপে। ভাসমান বেডের উপকরণ এবং পরবর্তীতে উৎপন্ন চারা, নার্সারি হতে আগত ফলজ ও বনজ চারা, হোগলপাতা হতে তৈরী উপকরন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ক্রয়-বিক্রয় এই অঞ্চলের মানুষদের করে তুলেছে স্বনির্ভর। বছরে প্রায় পঞ্চাশ কোটি টাকার বাণিজ্যের পাশাপাশি ত্রয়ী উপজেলায় খাদ্য নিরাপত্তা ও খাদ্য সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় বৈঠাকাটা বাজার নিঃসন্দেহে জল হতে হয়ে উঠেছে জলেশ্বরী।
