কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) থেকে মোহাম্মদ ছাইফ উল্লাহ হেলাল : লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগর উপজেলায় প্রায় ৭০টি অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধসহ কৃষিজমি, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও স্থানীয় সড়ক সুরক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন দুই সংসদ সদস্য। এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টুকে পৃথক চিঠি দিয়েছেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বীথিকা বিনতে হোসাইন।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাতে দুই সংসদ সদস্য তাঁদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে চিঠিগুলো প্রকাশ করেন। চিঠিতে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান, কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কাটা বন্ধ, অননুমোদিত বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, নিষিদ্ধ জ্বালানির ব্যবহার প্রতিরোধ এবং অতিরিক্ত ভারবাহী যানবাহন নিয়ন্ত্রণের দাবি জানানো হয়।
চিঠিতে পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান তাঁর চিঠিতে উল্লেখ করেন, রামগতি ও কমলনগর উপজেলার অধিকাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর। এ অঞ্চলের কৃষিজমি স্থানীয় মানুষের জীবিকা, খাদ্য উৎপাদন ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যক্তি কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে ইট তৈরিতে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে জমির উর্বরতা ও উৎপাদনক্ষমতা কমে কৃষকেরা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, অবৈধ ইটভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়া, ধুলাবালি ও অন্যান্য দূষণকারী উপাদান বায়ুদূষণ বাড়াচ্ছে। এর ফলে জনস্বাস্থ্য, স্থানীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চিঠিতে অতিরিক্ত মালামালবোঝাই ট্রাক্টর-টলি, ট্রাকসহ ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে গ্রামীণ সড়কে ভাঙন, খানাখন্দ ও গর্ত তৈরির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। এতে সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
অন্যদিকে, সংসদ সদস্য বীথিকা বিনতে হোসাইন তাঁর চিঠিতে রামগতি ও কমলনগরে প্রায় ৭০টি অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে এগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
তিনি বলেন, ইটভাটার কালো ধোঁয়া ও ধুলাবালির কারণে স্থানীয় মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা নারী, নবজাতক, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। এ ছাড়া ইটভাটার দূষণে ফলদ গাছের ফুল, কচি ফল ও পরিপক্ব ফল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টিও তাঁর চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
চিঠিতে অবৈধ ইটভাটায় ব্যবহৃত বিদ্যুৎ সংযোগ যাচাই করে অননুমোদিত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, নিষিদ্ধ জ্বালানি ব্যবহার বন্ধ, অতিরিক্ত ভারবাহী যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত পরিদর্শনের মাধ্যমে দূষণের প্রভাব নিরূপণের আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি মাটি ও ইট পরিবহনে ট্রাক্টরসহ ভারী যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
দুই সংসদ সদস্যই অবৈধ ইটভাটার তালিকা তৈরি, সরেজমিন তদন্ত, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও আইনগত অনুমোদন যাচাই এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বন্ধ হওয়া অবৈধ ইটভাটা পুনরায় চালু হওয়া এবং নতুন করে অবৈধ ইটভাটা স্থাপন ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত নজরদারির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।
এদিকে, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, মামলা ও স্থানীয়ভাবে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের পরও ইটভাটাগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
কমলনগর উপজেলার বাসিন্দা আবদুল আলী বলেন, “ইটভাটার কারণে আমরা অতিষ্ঠ। সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধ, দ্রুত সব অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করা হোক।”
রামগতি উপজেলার বাসিন্দা আশরাফুল আলম হান্নান বলেন, “লক্ষ্মীপুরের সব অবৈধ ইটভাটা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলমান থাকবে।”
এ বিষয়ে কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাহাতুজ্জামান জানান, উপজেলায় নতুন করে কোনো ইটভাটা স্থাপনের সুযোগ নেই। বর্তমানে যেসব অবৈধ ইটভাটা রয়েছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
এর আগেও উচ্চ আদালতে রিট
জানা গেছে, রামগতি ও কমলনগর উপজেলায় অবৈধ ইটভাটা বন্ধের দাবিতে ২০২৪ সালে উচ্চ আদালতে একটি রিট করা হয়। একই বিষয়ে ২০২৬ সালেও উচ্চ আদালতে আরেকটি রিট দায়ের করা হয়েছে।
এ অবস্থায় কৃষিজমি, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও স্থানীয় সড়ক সুরক্ষায় অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, সেদিকে তাকিয়ে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
