ফুলবাড়িয়া (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি : মো. আ. জব্বার : স্বপ্ন ছিল সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবেন৷ সে লক্ষ্যে এক-দুইজন নয়, আট সন্তানকেই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে দেশ-বিদেশে করেছেন প্রতিষ্ঠিত। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের স্বপ্ন পূরণে কাটিয়েছেন জীবনের দীর্ঘ পথ। তাদের দিয়েছেন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় অনুশাসন, সততা, নম্রতা, বিনয় ও কঠোর পরিশ্রমের শিক্ষা। ফুলবাড়ীয়ার ৯ নম্বর এনায়েতপুর ইউনিয়নের বেতবাড়ী গ্রামের মোশারফ হোসেনের জীবনসংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প তাই কেবল একটি পরিবারের অর্জনের গল্প নয়; এটি একজন বাবার ত্যাগ, অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও সন্তানদের মানুষ করে তোলার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ফুলখড়ির পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো এই সফল অভিভাবকের জীবন ও পরিবারের গল্প।
মোশাররফ হোসেন মরহুম আবুল হোসেনের ছেলে। পেশায় তিনি ছিলেন একজন ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট। ১৯৮০ সালে তিনি ১২নং আছিম পাটুলী ইউনিয়নের কালাইপাড় গ্রামের আমজাদ হোসেন চৌধুরীর কন্যা উম্মে কুলসুমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় আট সন্তান।
জীবনের নানা প্রতিকূলতা ও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েও সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন থেকে সরে আসেননি মোশাররফ হোসেন। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে, সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করে একে একে আট সন্তানকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন।
তার কাছে সন্তানদের শিক্ষিত করে তোলাই ছিল শেষ কথা নয়; তাদের প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাও ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি সন্তানদের ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা, সৎ, নম্র, বিনয়ী ও পরিশ্রমী হওয়ার শিক্ষাও দিয়েছেন।
বাবা-মায়ের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, নিরলস পরিশ্রম ও ত্যাগের ফল আজ তাদের সন্তানদের জীবনে দৃশ্যমান। আট সন্তানের কেউ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কাজ করছেন, কেউ উচ্চশিক্ষা শেষে বিদেশে অবস্থান করছেন, আবার কেউ এখনো উচ্চশিক্ষার পথে রয়েছেন। তাদের শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন ও পারিবারিক পরিচিতি পর্যায়ক্রমে তুলে ধরা হলো।
১. এইচ এম জুবায়ের
এইচ এম জুবায়ের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গভর্নমেন্ট অ্যান্ড পলিটিক্স বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পরে তিনি এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ফুলবাড়িয়া রয়েল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল ছিলেন। বর্তমানে তিনি ব্যবসায় মনোনিবেশ করেছেন। তার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস তানজিমুল উম্মাহর ময়মনসিংহ শাখায় শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত আছেন।
২. তানভীর হাসান
তানভীর হাসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবি বিষয়ে স্নাতক এবং ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পাশাপাশি ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাজিল ও কামিল পাস করেন। বর্তমানে তিনি বেসরকারি সংবাদভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল স্টার নিউজে প্রডিউসার হিসেবে কর্মরত আছেন।
তার স্ত্রী তানজিনা বিনতে নূর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফারসি বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে একই বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত।
৩. আবু হাসানাত
আবু হাসানাত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোল বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি একজন ব্যবসায়ী। তার স্ত্রী তৌহিদা ইসলাম দীর্ঘদিন একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন।
৪. সুমাইয়া বিনতে মোশাররফ
সুমাইয়া বিনতে মোশাররফ গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা সম্পন্নের পর অস্ট্রেলিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক করছেন। তিনি একজন চিত্রশিল্পী এবং সফল উদ্যোক্তা।
৫. মেহেদী হাসান
মেহেদী হাসান ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যানিমেল হাজবেন্ড্রি বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ফুলবাড়ীয়া শাখায় এজেন্ট ব্যাংকিং ইনচার্জ হিসেবে কর্মরত আছেন।
তার স্ত্রী আতকিয়া সামিহা সারাহ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে কিছুদিন শিক্ষকতায় নিয়োজিত ছিলেন।
৬. রাশিদ হাসান
রাশিদ হাসান রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি ইতালির ইউনিভার্সিটি অব কাগলিয়ারি-তে স্নাতকোত্তর করছেন। তার স্ত্রী ফেরদৌসী আক্তারও একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি একজন সনামধন্য ফ্যাশন ডিজাইনার।
৭. জওহর দোদায়েভ
জওহর দোদায়েভ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। তিনি একজন সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট।
৮. খালিদ হাসান
খালিদ হাসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। তিনি দৈনিক দেশ রূপান্তর পত্রিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির দপ্তর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
আট সন্তানের শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের এই পরিচিতির পেছনে রয়েছে একজন বাবার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও ত্যাগ। সন্তানদের জীবনে নিজের সেই স্বপ্নের প্রতিফলন দেখে মোশারফ হোসেনের কণ্ঠে ধরা পড়ে কৃতজ্ঞতা ও পরিতৃপ্তির সুর।
নিজের জীবন ও সন্তানদের নিয়ে ফুলখড়ি’র সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় মোশারফ হোসেন বলেন, “আমি আল্লাহ তায়ালার নিকট কোনো প্রকার ধন-সম্পদ চাইনি। সন্তানদেরকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে কবুল করার দোয়া করেছিলাম। আল্লাহ তায়ালা আমার দোয়া কবুল করেছেন। সেইজন্য আমি মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতি শুকরিয়া আদায় করি।”
মোশারফ হোসেন ২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর এনায়েতপুর পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তার স্ত্রী মরহুম উম্মে কুলসুম একজন গৃহিণী ছিলেন। দ্বিতীয় স্ত্রী শামীমা আক্তার দীর্ঘদিন শিক্ষকতায় যুক্ত ছিলেন।
জীবনের সাফল্যকে অনেক সময় অর্থ-সম্পদ দিয়ে পরিমাপ করা হয়। কিন্তু মোশারফ হোসেনের জীবনের গল্প অন্য এক অর্জনের কথা বলে-সন্তানদের শিক্ষিত করা, তাদের মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া এবং নিজ নিজ পথে এগিয়ে যাওয়ার উপযোগী করে গড়ে তোলা। আট সন্তানকে ঘিরে তার যে স্বপ্নযাত্রা, তা আজ একটি পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে অন্য অভিভাবকদের জন্যও অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে।
সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে একজন অভিভাবকের ত্যাগ যে কতটা সুদূরপ্রসারী হতে পারে, মোশারফ হোসেনের জীবন তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ফুলখড়ি পরিবারের পক্ষ থেকে এই সফল অভিভাবকের প্রতি রইল আন্তরিক শ্রদ্ধা ও শুভকামনা- তার জীবনসংগ্রামের গল্প আরও অনেক পরিবারকে স্বপ্ন দেখতে এবং সেই স্বপ্ন পূরণে অবিচল থাকতে সাহস জোগাক।
