স্টাফ রিপোর্টার : দেশের বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের অধিকার, চাকরির নিরাপত্তা এবং ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত “বেসরকারি সার্ভিস রুলস” প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের ঘোষণা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আজ বুধবার (১০ জুন) রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট (বিআইএম)-এর ১০০২ নম্বর কক্ষে “বেসরকারি সার্ভিস রুলস: আন্তর্জাতিক চর্চা ও করণীয়” শীর্ষক একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও বিআইএম-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিআইএম-এর মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. সলিম উল্লাহ।
সেমিনারে বক্তারা জানান, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে— “বেসরকারি চাকরিজীবীরা যাতে প্রাপ্য ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্য বেসরকারি সার্ভিস রুলস প্রণয়ন করা হবে।” এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গত ১৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের সভাপতিত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় বেসরকারি সার্ভিস রুলস প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্য কাঠামো ও বাস্তবায়ন কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার পাশাপাশি মে ২০২৬-এর মধ্যে একটি প্রাথমিক রূপরেখা বা আউটলাইন তৈরির জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। আজকের সেমিনারটি সেই রূপরেখা ও নীতিগত প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ারই একটি অংশ।
আজ সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে নিবন্ধন কার্যক্রমের মাধ্যমে সেমিনারের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিধি) মো. মোস্তফা জামান।
সেমিনারে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও উত্তম চর্চা বিষয়ে মূল প্রবন্ধ (কী-নোট পেপার) উপস্থাপন করেন বিআইএম-এর সহযোগী ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা সুমাইয়া আক্তার কেয়া এবং গবেষণা কর্মকর্তা জাকিয়া রহমান।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (গ্রেড-১) ড. গাজী সাইফুজ্জামান, শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোঃ আবদুছ সামাদ আল আজাদ সহ বেসরকারি শিল্প উদ্যোক্তাদের অনেকেই। শেষে সমাপনী বক্তব্য ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিআইএম-এর ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা এবং সেমিনার আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক এস. এম. আরিফুল ইসলাম।
উপস্থাপিত গবেষণাপত্রে বাংলাদেশের বিদ্যমান শ্রম আইন ও শ্রম বিধিমালার পাশাপাশি ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, চীন এবং ভিয়েতনামের শ্রম আইন ও শ্রম ব্যবস্থাপনার একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়। এতে কর্মঘণ্টা, মজুরি কাঠামো, শ্রমিক অধিকার, শিল্পসম্পর্ক, সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও পর্যালোচনা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
গবেষণায় দেখা যায়, আলোচিত দেশগুলোর শ্রম আইন কর্মীদের অধিকার রক্ষা ও শিল্পসম্পর্কের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে প্রণীত হলেও তাদের আইনি কাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় কিছু ভিন্নতা রয়েছে। যেমন—মালয়েশিয়া সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মক্ষেত্রে হয়রানি প্রতিরোধে বেশ অগ্রসর; থাইল্যান্ড শ্রমিক সুরক্ষা ও অভিবাসী শ্রমিক ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অনুসরণ করছে; শ্রীলঙ্কায় চাকরিচ্যুতি ও অবসর সুবিধা নিয়ে শক্তিশালী আইনি কাঠামো রয়েছে। অন্যদিকে, ভারত সাম্প্রতিক শ্রম কোড সংস্কারের মাধ্যমে আইনগুলোকে একীভূত করেছে, চীন কর্মসংস্থান চুক্তি ও সামাজিক বীমাকে গুরুত্ব দিয়েছে এবং ভিয়েতনাম কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সমষ্টিগত দরকষাকষির সুযোগ সম্প্রসারণ করেছে।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্পায়ন এবং সেবাখাতের বিকাশে বেসরকারি খাত মূল চালিকাশক্তি হলেও অনেক ক্ষেত্রে কর্মীরা ন্যায্য বেতন-ভাতা, চাকরির নিরাপত্তা, পদোন্নতি ও ছুটিসহ মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। বর্তমানে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ ব্যাংক-বীমা, শিল্পকারখানা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও আইটি খাতসহ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকলেও তাদের জন্য সরকারি কর্মজীবীদের মতো কোনো অভিন্ন ‘সার্ভিস রুলস’ নেই।
এই সংকট নিরসনে প্রস্তাবিত বেসরকারি সার্ভিস রুলসে—ন্যূনতম বেতন নির্ধারণ, নিয়মিত ইনক্রিমেন্ট, উৎসব বোনাস, বিভিন্ন ভাতা, নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতিমালা, চাকরির স্থায়ীকরণ, সুনির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, ছুটি ব্যবস্থাপনা, শৃঙ্খলা ও দুর্নীতি প্রতিরোধ বিধান, চাকরি থেকে অপসারণের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর কাঠামো অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
সেমিনারে সরকারের নীতিনির্ধারক, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক (এইচআর), শিল্প উদ্যোক্তা, গবেষক, শিক্ষাবিদ, শ্রম আইন বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তারা মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশের বাস্তবতায় একটি কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বেসরকারি সার্ভিস রুলস প্রণয়নের বিষয়ে স্ব-স্ব মতামত ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ তুলে ধরেন।
সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন, এই সেমিনারটি বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিতকরণে নীতিগত আলোচনা এবং ভবিষ্যৎ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে, যা দেশের শ্রমবাজারকে আরও সুশৃঙ্খল, জবাবদিহিমূলক ও কর্মীবান্ধব করে তুলবে।
৯২
