বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ৫, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশখুলনা সুন্দরবনের জন্য হুমকি রামপাল বিমান বন্দর

সুন্দরবনের জন্য হুমকি রামপাল বিমান বন্দর

বি এম রাকিব হাসান, খুলনা : বাগেরহাটের রামপালে প্রস্তাবিত খান জাহান আলী বিমানবন্দর প্রকল্পটি সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে। এ যেন ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সুন্দরবন যেটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রক্ষা কবচ হিসেবে পরিচিত তার জন্য গলার কাটা। বিমান বন্দর প্রকল্পটি ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট বনের কাছাকাছি হওয়ায় এর ভঙ্গুর প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের শঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবাদীরা ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। যদিও এই বিমানবন্দরটি মোংলা বন্দর, পর্যটন শিল্প এবং দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গতি আনবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কিন্তু বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের খুব কাছে হওয়ায় এর পরিবেশগত ঝুঁকিগুলো রীতিমত ভয়ংকর। একেতো রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সুন্দরবন ঝুঁকিতে রয়েছে। তার ওপর বিমান বন্দর প্রকল্প যেন বিপদে সাপে বর।

সূত্রমতে, সুন্দরবন আমাদের দেশের গর্ব। এটি শুধু এখন আর আমাদের বাংলাদেশেরই সম্পদ নয়- তা এখন বিশ্ব ঐতিহ্য অর্থাৎ ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ। পৃথিবীর একমাত্র এবং সবচেয়ে বৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। একক হিসেবে সুন্দরবন যেমন বৃক্ষের চাহিদা পূরণ করছে, ঠিক তেমনিভাবে একে উপলক্ষ করে শত-সহ¯্র মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্ভর করে। সেখানে প্রাকৃতিকভাবেই পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষিত হয়। তা ছাড়া বঙ্গোপসাগরের তীরে একটি বিরাট এলাকাজুড়ে তা বিস্তৃত থাকায় সমুদ্রের অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা প্রাকৃতিক দুর্যোগ রক্ষা করে দেশকে রক্ষা করে থাকে। বিশেষ করে মায়ের মত আগলে রাখে উপকুলবাসীকে।

পরিবেশবীদদের মতে, বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় সৃষ্ট তীব্র শব্দ সুন্দরবনের সংবেদনশীল বন্যপ্রাণী, বিশেষ করে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখির স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে। তীব্র শব্দের কারণে বন্যপ্রাণীরা তাদের চেনা আবাসস্থল ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে পারে, যা তাদের প্রজনন প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিমানবন্দর চালু হলে সুন্দরবনে পর্যটকদের যাতায়াত অনেক সহজ ও দ্রুত হবে। তবে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন সুন্দরবনের প্লাস্টিক দূষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাহীনতা এবং সামগ্রিক প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্টের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে। পর্যটক বাড়ার সাথে সাথে সুন্দরবনের ভেতরের নদী ও খালগুলোতে শ্যালো ইঞ্জিন বা যান্ত্রিক নৌকার চলাচল বাড়বে, যা পানির বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করবে।

এছাড়া বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে মোংলা ও রামপাল সংলগ্ন এলাকায় নতুন নতুন শিল্প-কারখানা, হোটেল ও রিসোর্ট গড়ে ওঠার প্রবণতা বাড়বে। এই এলাকাটি সুন্দরবনের পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা এর অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় অপরিকল্পিত নগরায়ণ বনের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। বিমান চলাচলের কারণে স্থানীয়ভাবে কার্বন এবং অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ বৃদ্ধি পেতে পারে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার সুন্দরবনের জন্য আরও ক্ষতিকর হতে পারে। সুন্দরবনে প্রায় ২৯০ প্রজাতিরও বেশি পাখির আবাসস্থল রয়েছে। শীতকালে এখানে প্রচুর পরিযায়ী পাখি আসে। বিমানবন্দর চালু হলে বিমানের যাতায়াত এবং রাত্রিকালীন তীব্র আলোর কারণে পাখিদের স্বাভাবিক ওড়ার পথ বিঘিœত হবে। তাছাড়া বিমানের সাথে পাখির ধাক্কা লাগার (ইরৎফ ঝঃৎরশব) আশঙ্কায় পাখিরা এই অঞ্চল এড়িয়ে চলতে শুরু করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমান চলাচল বা এভিয়েশন সেক্টর থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, জলীয় বাষ্প এবং ঝুল (ঝড়ড়ঃ) সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে, যার নেতিবাচক প্রভাব সুন্দরবনের মতো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিশ্ব ঐতিহ্য ও বাস্তুতন্ত্রের ওপর মারাত্মকভাবে পড়তে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও সুন্দরবন প্লাবিত হওয়া গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ বৃদ্ধির কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ছে, যার ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুন্দরবন সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে খুব বেশি উঁচুতে অবস্থিত নয়। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট এই উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সুন্দরবনের একটি বড় অংশ তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা সেখানকার জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংস করবে। লবণাক্ততা বৃদ্ধি সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ার কারণে জোয়ারের সময় নোনা পানি বনের ভেতরের মিষ্টি পানির উৎসগুলোতে প্রবেশ করছে। বিমান চলাচলসহ বিভিন্ন কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা যত বাড়বে, এই সমস্যা তত তীব্র হবে। লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে সুন্দরবনের প্রধান আকর্ষণ সুন্দরী গাছ ডাই-ব্যাক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে এবং গোলপাতার ফলন কমে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) খুলনার সমন্বয়কারী মো. বাবুল হাওলাদার বলেন, চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়া ও ঘূর্ণিঝড়গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে বায়ুম-ল ও সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় বঙ্গোপসাগরে ঘন ঘন এবং তীব্র ঘূর্ণিঝড় (যেমন: সিডর, আইলা, আম্পান, রেমাল) সৃষ্টি হচ্ছে। সুন্দরবন বাংলাদেশকে প্রাকৃতিক প্রাচীর হিসেবে রক্ষা করলেও, বারবার শক্তিশালী ঝড়ের আঘাতে বনের গাছপালা ও বন্যপ্রাণীর (যেমন: রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ) ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। তার ওপর খানজাহান আলী বিমান বন্দরে প্রভাব যেন সুন্দরবনে না পড়ে সেদিক লক্ষ্য রাখতে হবে। আর যদি সম্ভব হয় স্থান পরিবর্তন করে যেখানে সুন্দরবনের ওপর কোন প্রভাব পড়বে না এমন স্থান নির্বাচন করতে হবে।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা