শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬
প্রচ্ছদ ভ্রমণ চিকিৎসা প্রহসন, প্রান্তিক জীবন এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতা

চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গল-২

চিকিৎসা প্রহসন, প্রান্তিক জীবন এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতা

শ্রীমঙ্গল ফিরে জাহাঙ্গীর খান বাবু ও মৌলভীবাজার প্রতিনিধি সিরাজুল ইসলাম: প্রথম পর্বে আমরা দেখেছি কীভাবে দৈনিক মাত্র ১৮৭ টাকার জন্য এবং ২২ কেজির টার্গেট পূরণের জন্য চা শ্রমিকেরা নিজেদের জীবন বাজি রাখছেন। কিন্তু বঞ্চনার গল্প এখানেই শেষ নয়। এই চা শ্রমিকদের যখন অসুখ-বিসুখ হয়, কিংবা যখন তারা বাগানের বাইরে বিকল্প আয়ের খোঁজে যান, তখন তাদের মুখোমুখি হতে হয় আরও বড় নির্মমতার। দ্বিতীয় পর্বে আমরা অনুসন্ধান করেছি চা বাগানের চিকিৎসা ব্যবস্থার কঙ্কালসার রূপ এবং এই জনপদের প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার বিকল্প লড়াই।
কাগজে-কলমে চা বাগানগুলোতে হাসপাতালের চমৎকার ব্যবস্থা থাকার কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তা যেন এক একটি ‘রেফারেল কেন্দ্র’ বা নামমাত্র ডিসপেনসারি। ভাড়াউড়া বাগানের অভিজ্ঞ কর্মী ঊষা রানী হাজরা ক্ষোভের সাথে হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থার কঙ্কালসার রূপটি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মেডিকেলে গেলে যত বড় অসুখই হোক, ১০ টাকা ফি নিয়ে শুধু দুইটা ট্যাবলেট দেয়—নাপা আর হিস্টাসিন। হাত-পা কাটলে বা বড় অসুখ হলে বাইরে গিয়ে চিকিৎসা করতে হয়, যা করতে হাজার হাজার টাকা লাগে। আমাদের মতো গরিবের সেই টাকা কোথায়? ভাড়াউড়া চা বাগান হাসপাতালের ড্রেসার পান্নু কিবাট জানান, তিনি ১১,০০০ টাকা বেতনে ২০০৮ সাল থেকে কাজ করছেন এবং প্রতি মাসে তার বেতন থেকে ৭০০ টাকার বেশি প্রভিডেন্ট ফান্ড বাবদ কাটা হয়। তার দাবি, প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে গুরুতর রোগীদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা বালিশিরা মেডিকেল ডিপার্টমেন্টে পাঠানো হয়। অনুসন্ধানের দিন বিকেল ৪টায় ভাড়াউড়া চা বাগান হাসপাতালে সরজমিনে গিয়ে শুধু ড্রেসার পান্নু কিবাটকেই চেয়ারে বসে থাকতে দেখা যায়। কোনো রেজিস্টার্ড চিকিৎসক বা কম্পাউন্ডার সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। রোগীরা এসে ফিরে যাচ্ছেন অথবা ড্রেসারের দেওয়া নাপা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকছেন। অন্যদিকে, জাগছড়া চা বাগান হাসপাতালের কম্পাউন্ডার অনুসন্ধানী সাংবাদিক এসেছে ফোনে জানতে পেরে ২০ মিনিট পরে এসে ওমর ফারুক জানান, প্রতি মাসে এই হাসপাতাল থেকে গড়ে ১,২০০ রোগী চিকিৎসা নেন। ফিনলে কোম্পানির ৫টি বাগানের প্রতিটিতেই এমন একটি করে হাসপাতাল রয়েছে। তবে ১,২০০ রোগীর বিপরীতে পর্যাপ্ত ওষুধ বা সার্বক্ষণিক ডাক্তার না থাকা এই অঞ্চলের সাধারণ স্বাস্থ্য সেবাকে এক বড় প্রহসনে পরিণত করেছে।
চা বাগানের এই চরম অর্থনৈতিক শোষণ থেকে বাঁচতে অনেকেই বংশানুক্রমিক পেশা ছেড়ে বা পার্ট-টাইম হিসেবে বাইরের কাজের সন্ধান করছেন। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতরে কথা হয় ফল বিক্রেতা কানু’র সাথে। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, বাগানের ১৮৭ টাকা রোজে এখন একটা বাচ্চার দুধের টাকাও হয় না। তাই বাধ্য হয়ে লাউয়াছড়ায় পর্যটকদের কাছে ফল বিক্রি করি। কোনোদিন কিছু লাভ হয়, কোনোদিন পর্যটক না থাকলে উপোস থাকতে হয়। কিন্তু চা বাগানের ওই গোলামির চেয়ে এখানে অন্তত বুক ভরে শ্বাস নেওয়া যায়। কানুর মতো অনেক চা শ্রমিকের সন্তানই এখন বাগান থেকে বেরিয়ে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ফল বিক্রি, ট্যুরিস্ট গাইড বা দিনমজুরির কাজে জড়িয়ে পড়ছেন। কারণ, বাগানের স্থায়ী ‘লাইন ঘর’ আঁকড়ে ধরে রাখলে পেটে ভাত জোটে না।
শ্রীমঙ্গলের পর্যটন যখন রমরমা, লাউয়াছড়ায় যখন হাজারো পর্যটকের ভিড়, তখন তার ঠিক পাশেই জেমস ফিনলে কোম্পানির ভাড়াউড়া, খাইছড়া ও জাগছড়া বাগানের ভেতরের ঝুপড়ি ঘরগুলো একেকটি অন্ধকূপ। কাগজের ১৮৭ টাকা আর বাস্তব বাজারের মূল্যের ফারাক এই মানুষদের প্রতিনিয়ত ঋণের জালে জর্জরিত করছে। মালিকপক্ষের কঠোর নিয়ম, চিকিৎসার নামে প্রহসন আর প্রভিডেন্ট ফান্ডের মারপ্যাঁচে পিষ্ট চা শ্রমিকদের এই কান্না আজ আর শুধু বাগানের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। শ্রীমঙ্গলের সবুজ পাতার রসে যে চা প্রতিদিন কাপে ঝড় তোলে, তার প্রতিটি চুমুকে মিশে আছে এই হাজারো শ্রমিকের ঘাম, রক্ত আর বেঁচে থাকার তীব্র আকূতি। এই বঞ্চনার অবসান ঘটাতে মালিকপক্ষ, চা সংসদ এবং সরকারের যৌথ ও দ্রুত পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা