শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬
প্রচ্ছদ নাফ নদীতে আরকান আর্মি আতঙ্ক

নাফ নদীতে আরকান আর্মি আতঙ্ক

হাবিবুর রহমান, ঢাকা: বাংলাদেশে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার নাফ নদীতে আরাকান আর্মির উৎপাত ও অত্যাচার বেড়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অরাষ্ট্রীয় শাসক আরাকান আর্মি এখন মংডু শহরের ঢালে বঙ্গোপসাগরে ও নফ নদীর বাংলাদেশ অংশে মাঝে মাঝেই হানা দিচ্ছে। মিয়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি নাফ নদীতে মাছ আহরণরত বাংলাদেশি জেলেদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নিয়ে যাচ্ছে। গতকাল সোমবারও টেকনাফ উপকূল থেকে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যাওয়া একটি ট্রলারসহ পাঁচ জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ)। গতকাল সোমবার সকালে এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন টেকনাফ পৌরসভার কায়ুকখালী ঘাট বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম। সীমান্তবর্তী নাফ নদী জেলেদের জন্য আতঙ্কের জলপথে পরিণত হয়েছে।
জানা গেছে, অপহৃত পাঁচ মাঝিমাল্লা উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দা। অপহৃতরা হলেন মাঝি সালাম নুর (৩১), মো. আইয়ুব (৩৭), মো. আজিজুল্লাহ (৩০), সৈয়দ হোসেন (২৫) এবং মো. আইয়ুব (২৪)।
স্থানীয় জেলেদের ভাষ্য, গত রোববার সকালে প্রতিদিনের মতো টেকনাফের কায়ুকখালী ঘাট থেকে সাবরাং ইউনিয়নের আলীর ডেইল গ্রামের বাসিন্দা আলী আহমদের মালিকানাধীন একটি ট্রলার মাছ ধরার উদ্দেশ্যে সাগরে যায়। পরে ছেঁড়া দ্বীপসংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে আরাকান আর্মির সদস্যরা ট্রলারটিকে ধাওয়া করে আটক করে এবং ট্রলারসহ পাঁচ জেলেকে নিয়ে যায়। এ সময় আশপাশে থাকা আরও কয়েকটি মাছ ধরার ট্রলার দ্রুত এলাকা ছেড়ে নিরাপদে সরে যেতে সক্ষম হয়।
বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম বলেন, সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া একটি ট্রলারসহ পাঁচ মাঝিমাল্লাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিষয়টি জানার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। হঠাৎ করে আবারও জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় উপকূলের জেলেপল্লিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শাহপরীর দ্বীপের নাইক্ষ্যংদিয়ার জলসীমা অংশে একের পর এক ট্রলারসহ জেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। টেকনাফ থেকে ট্রলার নিয়ে সাগরে যাওয়া কিংবা মাছ শিকার করে ট্রলার নিয়ে ফেরার সময় অস্ত্রের মুখে ধরে নিয়ে যাচ্ছে তারা। জেলেদের উদ্ধারে পদক্ষেপ ও নাইক্ষ্যংদিয়া এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছে ট্রলার মালিক সমিতি। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আরাকান আর্মি খাবারসহ প্রয়োজনীয় পণ্য ও টাকা আয়ের জন্যই এমন অপতৎপরতা চালাচ্ছে।
এর আগে গত ১৫ জুন সকাল ৮টার দিকে শাহপরীর দ্বীপ সংলগ্ন নাফ নদীর মোহনা এলাকা থেকে মাছ ধরার সময় দুটি ইঞ্জিনচালিত নৌকাসহ ৭ জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। আটক জেলেরা হলেন; টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা মো. ফায়সাল, সৈয়দুর রহমান, সৈয়দ আলম, মো. হেলাল, মো. জলিল, আজম উল্লাহ এবং মোহাম্মদ ফয়সাল আহমেদ।
জেলে আলী আহমদ জানান, নাফ নদী ও সাগরে মাছ ধরা এখন জেলেদের জন্য অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। সব সময় আরাকান আর্মির আতঙ্ক তাদের মধ্যে কাজ করে। সুযোগ পেলেই আরাকান আর্মির সদস্যরা স্পিডবোটে এসে অস্ত্রের মুখে জেলেদের আটক করে নিয়ে যায়।
এদিকে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হাতে আটক জেলেদের উদ্ধারে সরকারকে তৎপর হতে অনুরোধ করেছে নিখোঁজদের পরিবার। তারা বলছে, গত পাঁচ মাসে টেকনাফ ও সেন্ট মার্টিনের কমপক্ষে ৪২০ জন জেলেকে বাংলাদেশের জলসীমা থেকে তুলে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি। তাঁদের ছাড়িয়ে আনতে সরকার কোনো ধরনের তৎপরতা চালাচ্ছে না।
সেন্ট মার্টিনের বাসিন্দা মো. যোবায়ের বলেন, নামে মাত্র দুই মাস পর্যটন হলেও আমাদের বাপদাদাদের মূল পেশা মৎস্য শিকার। আমাদের মূল পেশার ওপর আঘাত আসছে। মাছ ধরতে গেলে আরাকান আর্মি আমাদের জলসীমা থেকে আমাদের জেলেদের অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে। সরকার নিরাপত্তা দিতে পারছে না।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব একোয়াকালচারের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, সেন্ট মার্টিনের বাসিন্দাদের দুঃখদুর্দশা শুনলে হৃদয় ভারী হয়ে আসে। নিখোঁজের পরিবার শুধু জানতে চাচ্ছে, তাদের স্বজনেরা বেঁচে আছে কি না। রাষ্ট্র সেটাও পূরণ করতে পারছে না।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া একটি ট্রলারসহ পাঁচ মাঝিমাল্লাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার খবর পেয়েছি। প্রাথমিকভাবে জেনেছি, তারা সবাই রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দা। বিষয়টি নিয়ে আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।

 

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা