কক্সবাজার প্রতিনিধি: দীর্ঘ কয়েক মাসের বিরতির পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির (এএ) মধ্যে আবারও তীব্র সশস্ত্র সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। বিমান হামলা, ড্রোন আক্রমণ ও ভারী গোলাবর্ষণের বিকট শব্দে কাঁপছে বাংলাদেশের টেকনাফ সীমান্ত। সীমান্তবর্তী এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক, যদিও প্রশাসন জানিয়েছে—বাংলাদেশের সীমান্ত সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বুধবার রাত ১০টা থেকে থেমে থেমে গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। মধ্যরাতের পর থেকে ভোর পর্যন্ত আকাশে আগুনের ঝলকানি ও একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দে টেকনাফের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকার ঘরবাড়ি কেঁপে ওঠে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালেও দফায় দফায় গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস. এম. অনীক চৌধুরী জানান, সীমান্তের ওপারে বিমান হামলার ঘটনা ঘটছে। তবে বিজিবি ও কোস্টগার্ড সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং বাংলাদেশের সীমান্ত শতভাগ নিরাপদ আছে। সীমান্তবাসীকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। জালিয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক বলেন, রাতভর গোলাগুলির শব্দ এবং আগুনের শিখা দেখা গেছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বেড়েছে।
মিয়ানমারভিত্তিক গণমাধ্যম দ্য ইরাবতী-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহ ধরে জান্তা বাহিনী আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে ড্রোন ও যুদ্ধবিমান থেকে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে জনবসতিপূর্ণ এলাকাতেও হামলার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, চলমান সংঘাতে সামরিক ও বেসামরিক মিলিয়ে শতাধিক মানুষ হতাহত হয়েছেন এবং বহু বসতি ও স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে।
রাখাইন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী টেকনাফে বসবাসরত পুরাতন রোহিঙ্গা কলিম উল্লাহ জানান, প্রায় চার থেকে পাঁচ মাস শান্ত থাকার পর জান্তা বাহিনী নতুন কৌশলে স্থল, নৌ ও আকাশপথে হামলার তীব্রতা বাড়িয়েছে। যুদ্ধ এখন বাংলাদেশ সীমান্তের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে, ফলে সীমান্ত এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। সীমান্ত ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, সংঘাতের কারণে টেকনাফ স্থলবন্দরের কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। নাফ নদীতে নিরাপত্তাজনিত কারণে জেলেদের মাছ ধরাও সীমিত হয়ে গেছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি মোহাম্মদ শরীফ জানান, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে গুলিবিনিময় শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্তের ওপারে কয়েকটি রোহিঙ্গা পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে সীমান্তমুখী হওয়ার খবরও পাওয়া যাচ্ছে।
সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, বহুদিন পর আবার এমন ভয়াবহ সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। বিস্ফোরণের শব্দে মানুষের ঘরবাড়ি কেঁপে উঠছে এবং অনেকে আতঙ্কে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছেন।
টেকনাফ ব্যাটালিয়ন (২ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হানিফুর রহমান ভূঁইয়া জানান, বুধবার রাত ৯টার দিকে মিয়ানমারের মংডু সীমান্ত এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এর বিকট শব্দ টেকনাফের সীমান্তবর্তী এলাকাতেও শোনা গেছে। বিষয়টি যাচাই করতে তিনি নিজেই সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। স্থানীয় জেলে রফিক মিয়া জানান, বৃহস্পতিবার সকালে নাফ নদীর হোয়াইক্যং উলুবনিয়া পয়েন্টে মাছ ধরতে গিয়ে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে গোলাগুলির শব্দ শুনেছেন। পরে দুপুরে ফিরে এসে স্থানীয়দের কাছে পরিস্থিতির বর্ণনা দেন।
উল্লেখ্য, সর্বশেষ গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর এবং চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে বড় ধরনের সংঘর্ষ হয়েছিল। বর্তমানে রাখাইনের অধিকাংশ টাউনশিপ আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, কৌশলগতভাবে আরাকান আর্মি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও চলমান সংঘাত সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও স্থানীয় জনজীবনে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
৮৩
