কক্সবাজার প্রতিনিধি: কক্সবাজার সদর উপজেলার পিএমখালী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে খেলা দেখার সময় ছৈয়দুল হক নামের এক ব্যক্তিকে পুরোনো মামলার ওয়ারেন্টের কথা বলে আটক করে পরে ডাকাতির প্রস্তুতির নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখানোর অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। এ ঘটনাকে ঘিরে এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী ও মামলার দুই সাক্ষীর দাবি, ১ জুলাই ২০২৬ (বুধবার) রাত প্রায় ৯টার দিকে পিএমখালী ইউনিয়নের পশ্চিম পাতলীর দিঘির পাড় এলাকার একটি চায়ের দোকানে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখার সময় সিভিল পোশাকে আসা তিনজন পুলিশ সদস্য ছৈয়দুল হককে আটক করেন। সে সময় তারা উপস্থিত লোকজনকে জানান, তার বিরুদ্ধে পূর্বের একটি মামলায় ওয়ারেন্ট রয়েছে এবং সেই মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ছৈয়দুল হক গত চার মাস ধরে পাশের একটি জমির কেয়ারটেকার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রতিদিনের মতো সেদিনও রাতের পাহারার উদ্দেশ্যে বের হয়ে খেলা দেখার জন্য চায়ের দোকানে বসেন।
এ সময় একটি সিএনজি থেকে সিভিল পোশাকে তিনজন পুলিশ সদস্য নেমে উপস্থিত লোকজনের কাছে ছৈয়দুল হকের পরিচয় জানতে চান। পরে নিজেই নিজের পরিচয় দিলে পুলিশ তাকে তল্লাশি করে একটি ছোট ফল কাটার ছুরি উদ্ধার করে। এরপর উপস্থিত সবাইকে ওই ছুরি দেখিয়ে জানানো হয়, তাকে পূর্বের ওয়ারেন্টভুক্ত মামলায় আটক করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের আরও দাবি, পরদিন সকাল প্রায় ৯টার দিকে পুলিশ আবার ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত কয়েকজনের স্বাক্ষর নেয়। কেন স্বাক্ষর নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে পুলিশ জানায়, ছৈয়দুল হকের কাছ থেকে একটি ছুরি উদ্ধারের বিষয়টি নথিভুক্ত করার জন্যই স্বাক্ষর নেওয়া হচ্ছে।
তবে দুই দিন পর মামলার এজাহার দেখে তারা বিস্মিত হন। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ছৈয়দুল হককে অন্য একটি স্থান—ছাগলকাটা এলাকা থেকে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে টিপ ছুরি, লোহার রডসহ বিভিন্ন সরঞ্জামসহ আটক করা হয়েছে।
আটক ছৈয়দুল হকের স্ত্রী অভিযোগ করেন, তার স্বামী প্রায় ১২ বছর ওমানে প্রবাসী ছিলেন। দুই বছর আগে দেশে ফিরে আসেন এবং গত চার মাস ধরে পশ্চিম পাতলীর একটি জমির কেয়ারটেকারের দায়িত্ব পালন করছিলেন।
তার দাবি, জমির মালিকের সঙ্গে একটি পক্ষের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। সেই বিরোধের জের ধরেই তার স্বামীকে হয়রানির উদ্দেশ্যে প্রশাসনকে ব্যবহার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমার স্বামীকে রাত ৯টার দিকে চায়ের দোকান থেকে আটক করা হলেও মামলার এজাহারে রাত ১২টার পর ছাগলকাটা এলাকা থেকে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে আটক দেখানো হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “২০০৭ সালের একটি ডাকাতির প্রস্তুতি মামলায় আমার স্বামীর বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ছিল। যদি সেই মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হতো, তাহলে অন্তত বুঝতে পারতাম। কিন্তু নতুন করে সাজানো মামলা দেওয়া হয়েছে বলে আমাদের ধারণা।”
তার ভাষ্য, পাহারার কাজে ব্যবহারের জন্য আত্মরক্ষার্থে তার স্বামীর কাছে প্রায় ৩০ টাকা মূল্যের একটি ছোট ফল কাটার ছুরি ছিল, যেটিকে মামলায় ‘টিপ ছুরি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার ১ নম্বর সাক্ষী ও স্থানীয় গ্রামপুলিশ জসিম উদ্দিন বলেন, তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন তিনজন সাদা পোশাকের পুলিশ একটি সিএনজি থেকে নেমে ছৈয়দুল হককে খুঁজছেন। পরে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তার কোমর থেকে একটি ছোট ছুরি উদ্ধার করা হয় এবং উপস্থিত লোকজনকে সেটি দেখানো হয়।
তার দাবি, পুলিশ সেদিন জানিয়েছিল ছৈয়দুল হককে ওয়ারেন্টভুক্ত মামলায় আটক করা হয়েছে। পরদিন তাদের কাছ থেকে ছুরি উদ্ধারের বিষয়ে স্বাক্ষরও নেওয়া হয়। কিন্তু পরে জানতে পারেন তাকে ডাকাতির প্রস্তুতি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
মামলার ২ নম্বর সাক্ষী ফয়সালও একই ধরনের বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, “আমাদের সামনে তাকে ওয়ারেন্ট মামলায় আটক করা হয়েছে বলা হয়েছিল। আমরা শুধু একটি ছোট ছুরি দেখেছি। মামলায় যেসব অস্ত্র ও সরঞ্জাম উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে, তার কিছুই আমরা দেখিনি।”
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, বিষয়টি তার নজরে এসেছে এবং তিনি তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। তদন্ত কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তি একজন পেশাদার ছিনতাইকারী বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে।
এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা এএসআই নজরুল বলেন, “ছৈয়দুল হককে ছাগলকাটা এলাকা থেকে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে আটক করা হয়েছে। তার কাছ থেকে ছুরি ও ডাকাতির প্রস্তুতির বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।”
স্থানীয় ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জামাল উদ্দিন বলেন, তার জানামতে ছৈয়দুল হক পূর্বে ডাকাতি বা ছিনতাইয়ের মতো কোনো অপরাধে জড়িত ছিলেন না। তিনিও ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানান।
ঘটনাটি নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী, পরিবারের সদস্য এবং মামলার সাক্ষীদের বক্তব্যের সঙ্গে পুলিশের বর্ণনার উল্লেখযোগ্য অমিল রয়েছে বলে তাদের দাবি।
পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার নিরপেক্ষ ও পুনঃতদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা হোক। একই সঙ্গে তারা বলেন, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আটক হওয়ায় পরিবারটি বর্তমানে মানবিক সংকটে পড়েছে।
