শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ সবুজ স্বর্গ থেকে সংকটাপন্ন অভয়ারণ্য: দখল-উজাড়ে ধুঁকছে লাউয়াছড়া, খাদ্যের খোঁজে লোকালয়ে ছুটছে বন্যপ্রাণী

সবুজ স্বর্গ থেকে সংকটাপন্ন অভয়ারণ্য: দখল-উজাড়ে ধুঁকছে লাউয়াছড়া, খাদ্যের খোঁজে লোকালয়ে ছুটছে বন্যপ্রাণী

শাহাব উদ্দিন আহমদ, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধিঃ মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ চিরহরিৎ বন ও পর্যটন কেন্দ্র লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান দীর্ঘদিন ধরে দখল, বন উজাড় ও অব্যবস্থাপনার কারণে ক্রমেই তার প্রাণ-প্রকৃতি হারাচ্ছে। ১৯২৫ সালে তদানীন্তন ব্রিটিশ সরকারের বনায়ন কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এই বনভূমিকে ১৯৯৬ সালে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জাতীয় উদ্যান’ ঘোষণা করে। ১ হাজার ২৫০ হেক্টর আয়তনের এই বন দেশের ৭টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও ১০টি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, এখানে প্রায় ৪৬০ প্রজাতির দুর্লভ উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে, যার মধ্যে আছে ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২৪৬ প্রজাতির পাখি, ৬ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ৪ প্রজাতির উভচর প্রাণী। স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে রয়েছে বিলুপ্তপ্রায় উল্লুক (হুলক গিবন), মুখপোড়া হনুমান, চশমাপরা হনুমান, সিংহ বানর, লজ্জাবতী বানর, চিত্রা হরিণ, মেছোবাঘ, চিতাবিড়াল, বনবিড়াল, বনরুই, গন্ধগোকুল, বাগডাশ, সজারু, শেয়াল, বন্যকুকুর ও কাঠবিড়ালি। সরীসৃপের মধ্যে আছে অজগর সাপসহ বিভিন্ন প্রজাতির বিষধর ও নির্বিষ সাপ এবং গুইসাপ। পাখির মধ্যে পাহাড়ি ময়না, ধনেশ, মথুরা, সবুজ ঘুঘুসহ বিচিত্র প্রজাতির পাখি এই বনের প্রধান আকর্ষণ, যাদের দেখতে প্রতি বছর দেশ-বিদেশ থেকে পাখিপ্রেমী ও প্রকৃতিপ্রেমীরা ছুটে আসেন।

বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের অবস্থা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে করেন গবেষকরা। তাঁদের ভাষ্যে, অতিরিক্ত বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস ও খাদ্য সংকটের কারণে এই প্রজাতির অস্তিত্ব মারাত্মক হুমকির মুখে। এ ছাড়া ১৯৯৭ সালে মাগুরছড়ায় গ্যাসকূপ বিস্ফোরণের অগ্নিকাণ্ডে বনের একটি বড় অংশ পুড়ে যাওয়ার ক্ষত এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা যায়নি বলে মনে করেন পরিবেশবিদরা। স্থানীয় সূত্র জানায়, বিগত প্রায় তিন দশকেও লাউয়াছড়ার সীমানা নির্ধারণ (ডিমার্কেশন) চূড়ান্ত না হওয়ায় বনের চারপাশের জমি একের পর এক দখল হয়ে গেছে। দখলকৃত জমিতে অনেকে গড়ে তুলেছেন চা, লেবু ও আনারসের বাগান, এমনকি বাড়িঘরও নির্মাণ করা হয়েছে। সম্প্রতি বন বিভাগ অভিযান চালিয়ে কয়েক একর দখলকৃত বনভূমি উদ্ধার করলেও বনের প্রকৃত সীমানা এখনো সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়নি। এর পাশাপাশি মূল্যবান গাছ, বাঁশ ও বেত চুরির ঘটনাও থেমে নেই, যা বনের ঘনত্ব ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য দুটোই নষ্ট করছে।
বন উজাড় ও আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ায় খাদ্যের সন্ধানে বিষধর সাপ, বনবিড়াল, মেছোবাঘ ও হরিণের মতো প্রাণী প্রায়ই লোকালয়ে চলে আসছে। লাউয়াছড়া সংলগ্ন এলাকার অনেক বসতবাড়িতে মাঝেমধ্যেই বিষধর সাপ পাওয়ার খবর মেলে। অজগর সাপ লোকালয়ে এসে পালিত গবাদিপশু খেয়ে ফেলার ঘটনাও নতুন নয়। উদ্ধার হওয়া এসব সাপ পরে বন্য প্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ফের লাউয়াছড়াতেই অবমুক্ত করা হয়, তবে বনের ভেতর এদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা নেই বলে জানা গেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এভাবে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে সাপের সংখ্যা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে তা মানুষের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে লাউয়াছড়ার ভেতর দিয়ে যাওয়া শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সড়ক, ঢাকা-সিলেট রেলপথ ও বিদ্যুতের গ্রিড লাইন বন্যপ্রাণীর জন্য এখন মূর্তিমান আতঙ্ক। উল্লুক, হনুমান, সিংহ বানর, অজগর, বেজি, মেছোবাঘসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী প্রায়ই যানবাহনের চাপায়, ট্রেনে কাটা পড়ে কিংবা বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে মারা যাচ্ছে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, এভাবে প্রতিদিন গড়ে কয়েকটি করে প্রাণী মারা যাচ্ছে, যা বিরল প্রজাতির প্রাণীর টিকে থাকার জন্য বড় হুমকি। বন বিভাগ সড়কে যানবাহনের গতি ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার উদ্যোগ নিলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
লাউয়াছড়ায় বন বিভাগের একটি রেস্ট হাউস, কয়েকটি পাবলিক রেস্তোরাঁ, পায়ে চলার তিনটি ট্রেইল (আধা ঘণ্টা, এক ঘণ্টা ও তিন ঘণ্টার), ইকো-গাইড সুবিধা ও একটি তথ্যকেন্দ্র রয়েছে, যা পর্যটকদের জন্য ইতিবাচক দিক। তবে বনের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় না নিয়েই প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পর্যটকের প্রবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন পরিবেশবিদরা। পর্যটকদের একাংশের বিরুদ্ধে বনের ভেতর ব্লুটুথ স্পিকারে উচ্চ শব্দে গান বাজানো, হইহুল্লোড় করা, বানরসহ বন্যপ্রাণীকে উত্ত্যক্ত করা এবং যত্রতত্র প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার অভিযোগ রয়েছে, যাতে প্রাণীদের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস, চলাচল ও প্রজননে ব্যাঘাত ঘটছে বলে মনে করেন গবেষকরা। এই চাপ কমাতে বন বিভাগ ইতিপূর্বে প্রবেশ ফি দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়েছিল, যা নিয়ে পরিবেশবাদীরা সন্তোষ প্রকাশ করলেও সাধারণ পর্যটকদের একটি অংশ ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। এ ছাড়া বনের ভেতরের সড়কে গতিসীমা তদারকির জন্য পৃথক হাইওয়ে পুলিশ মোতায়েনের দাবিও দীর্ঘদিনের, যা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, লাউয়াছড়াকে রক্ষা করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন বনের সুস্পষ্ট সীমানা নির্ধারণ ও দখলমুক্ত করার কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা। এর পাশাপাশি বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া সড়ক ও রেলপথে যানবাহনের গতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রয়োজনে পৃথক হাইওয়ে পুলিশ মোতায়েন করা কিংবা বিকল্প সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়ন, বন্যপ্রাণীর খাদ্য উপযোগী গাছ রোপণের মাধ্যমে প্রাকৃতিক খাদ্যচক্র পুনরুদ্ধার, উদ্ধার হওয়া সাপ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী অবমুক্তকরণে একটি বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন, গাছ ও বাঁশ-বেত চুরি রোধে বন বিভাগের টহল জোরদার, বনের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে পর্যটক সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বন সংরক্ষণ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করে বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করা গেলে দখল ও বন নিধন অনেকাংশে কমে আসবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়া না গেলে বাংলাদেশের অন্যতম সমৃদ্ধ এই চিরহরিৎ বন তার জীববৈচিত্র্য হারিয়ে ফেলবে, যার প্রভাব পড়বে দেশের পর্যটন খাত ও প্রতিবেশ ভারসাম্যেও। লাউয়াছড়ার প্রকৃতি ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় এখনই প্রয়োজন প্রশাসন, বন বিভাগ ও স্থানীয় জনগণের সমন্বিত ও টেকসই উদ্যোগ।

 

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা