শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) থেকে শাহাব উদ্দিন আহমেদ : মৌলভীবাজারের প্রাকৃতিক সম্পদের অন্যতম ভান্ডার শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওর একসময় দেশীয় মাছ, ধান আর জীববৈচিত্র্যের অফুরন্ত উৎস হিসেবে পরিচিত ছিল। অথচ ভূমি দখল, অপরিকল্পিত মাছের খামার, ভরাট আর যোগাযোগব্যবস্থার অভাবে সেই ঐতিহ্যবাহী হাওর আজ নানামুখী সংকটে দিন কাটাচ্ছে। একদিকে বিলুপ্তির পথে হারিয়ে যাচ্ছে সুস্বাদু দেশীয় মাছ, অন্যদিকে ন্যায্য মূল্য ও অবকাঠামোর অভাবে কৃষিকাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন কৃষকেরা। স্থানীয়দের মতে, উপযুক্ত রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ ও সেচব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এই হাওরই আবার হয়ে উঠতে পারে ধান-মাছের পাশাপাশি হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালনের এক বিশাল সম্ভাবনার ক্ষেত্র।
মৌলভীবাজার জেলার সদর ও শ্রীমঙ্গল এবং হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত হাইল হাওরের মোট আয়তন প্রায় ১০ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে রয়েছে ৪ হাজার হেক্টর প্লাবন ভূমি, ৪ হাজার ৫১৭ হেক্টর হাওর, ১ হাজার ৪০০ হেক্টর বিল, ৪০ হেক্টর খাল ও ৫০ হেক্টর নদী। প্রচুর লতা ও গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ থাকায় স্থানীয়দের কাছে এটি ‘লতাপাতার হাওর’ নামেও পরিচিত। গোপলা ও বিজনা নদীবিধৌত এই হাওরে একসময় ছিল ছোট-বড় বহু বিল আর অসংখ্য ছড়া (খালের মতো পানিপ্রবাহ)। এলাকায় প্রবাদ প্রচলিত আছে—‘৩৫২ ছড়ার হাইল হাওর’। কিন্তু বাস্তবে সেই ছড়া ও বিলের বড় অংশই আজ হারিয়ে গেছে।
হাইল হাওরের সবচেয়ে বড় ক্ষতির চিত্র ফুটে ওঠে এর মৎস্যসম্পদে। এক সময় এই হাওরে ৯৮ প্রজাতির দেশীয় মাছের অবাধ বিচরণ ছিল। কিন্তু বর্তমানে এর মধ্যে অন্তত ২১ প্রজাতির মাছ পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে, আরও ১১ প্রজাতি রয়েছে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। হারিয়ে যাওয়া মাছের তালিকায় আছে বাচা, ঘারুয়া, ছেপচালা, বাঘাইড়, ঢেলা, রিটা, বাঁশপাতা, রানী, নাফতানি, নাপিত কই, তারা বাইম, বামোশ, বড় বাইম, তিতপুঁটি, নামা চান্দা, একথুটি, চাকা, শ্বেত সিংগি ও শ্বেত মাগুরের মতো এক সময়ের সুপরিচিত মাছ। এ ছাড়া পাবদা, আইড়, বেদা, মিনি, ফলি, গজার, গুলশা, দাড়কিনি, চিতল, টাটকিনিসহ বেশ কয়েকটি প্রজাতি এখন বিলুপ্তপ্রায়। প্রজননের মৌসুমে অবাধে মাছ শিকার, অভয়াশ্রমের অভাব আর প্রতিবেশগত সংকটকেই এর প্রধান কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে দেশীয় মাছ কমে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে স্থানীয়রা দায়ী করছেন হাওরের বিল ও ছড়া দখল করে গড়ে ওঠা অপরিকল্পিত মাছের খামারকে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে একশ্রেণির প্রভাবশালী মহল খাসজমি এবং ভূমিহীনদের নামে বন্দোবস্ত দেওয়া সরকারি জমি নানা কৌশলে দখলে নিয়ে বিশাল বিশাল পুকুর কেটে বাণিজ্যিক মাছের খামার গড়ে তুলছেন। ১৯৮০ সালের পর থেকে হাওরে বাণিজ্যিক মাছ চাষ শুরু হলেও ২০০০ সালের পর তা ব্যাপক রূপ নেয়। মাটি কেটে পুকুর খনন আর ভরাটের ফলে হাওরের অনেক বিল ইতিমধ্যে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে, বেশ কিছু বিলের এখন কোনো হদিসই নেই। এমনকি পানিপ্রবাহের ছড়াগুলোও দখল হয়ে যাওয়ায় হাওরে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, ক্ষতির মুখে পড়ছেন বোরো চাষিরাও। গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত নানা জলজ উদ্ভিদও এতে ধ্বংস হচ্ছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, মাছ ও পাখির নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে খ্যাত বাইক্কা বিল অভয়াশ্রমও এই দখলের ঢেউ থেকে মুক্ত নয়। ২০০৩ সালে সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয় হাইল হাওরের পূর্বদিকের প্রায় ১০০ হেক্টরের এই জলাভূমিকে মৎস্য অভয়াশ্রম হিসেবে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়। এর সুফলও মিলেছে—অভয়াশ্রম গড়ে তোলায় বিলুপ্তপ্রায় অনেক প্রজাতির মাছ এখানে বংশবৃদ্ধি করে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে গোটা হাওরে, শীত মৌসুমে হাজারো পরিযায়ী পাখির কলতানে মুখর হয়ে ওঠে বিলটি। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, এই অভয়াশ্রম ও তার আশপাশের এলাকায়ও মাটি কেটে কেটে বড় বড় মাছের খামার গড়ে তুলে জলাভূমি নষ্ট করে ফেলছে একশ্রেণির ভূমিদস্যু। যথাযথ তদারকি ও দ্রুত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ না নিলে হাওরের প্রাণ হিসেবে পরিচিত এই বাইক্কা বিলের অস্তিত্বও হুমকিতে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবাদীরা।
মাছের পাশাপাশি সংকটে পড়েছে হাওরঘেঁষা কৃষিও। স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্যে, এমন একটা সময় ছিল যখন এই অঞ্চলে মানুষের সংখ্যা ছিল কম। কৃষক ফজরের আজানের সঙ্গে সঙ্গে দুটি গরু আর একটি লাঙল-জোয়াল কাঁধে নিয়ে কাদামাটি ভেঙে চলে যেতেন হাওরে। গরু দিয়ে হাল চাষ করে যে ধান ফলাতেন, তা দিয়েই অনায়াসে চলে যেত ছোট সংসার। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। যে গ্রামে আগে হয়তো এক হাজার সংসার ছিল, এখন সেখানে সংসারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে কয়েক গুণ। ফলে বাড়তি চাহিদা অনুযায়ী চাষাবাদ বাড়ছে না বলে জানান স্থানীয় কৃষকেরা।
গরু-লাঙলের জায়গা এখন নিয়েছে ট্রাক্টরসহ যান্ত্রিক চাষযন্ত্র। ধান চাষের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি বর্তমানে সহজলভ্য হলেও সেগুলো সরাসরি হাইল হাওরের অনেক জায়গায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। কারণ, হাওরের ভেতরে ও আশপাশে নেই পর্যাপ্ত রাস্তাঘাট। ভালো যোগাযোগব্যবস্থার অভাবে জমিতে যন্ত্রপাতি পৌঁছাতে যেমন ভোগান্তি পোহাতে হয়, তেমনি ফসল ঘরে তুলতেও গুনতে হয় বাড়তি খরচ। অন্যদিকে চাষে যে পরিমাণ খরচ হয়, উৎপাদিত ধানের দাম মেলে তার তুলনায় অনেক কম। ফলে পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে কৃষিকাজে উৎসাহ হারাচ্ছেন কৃষকেরা। এমন পরিস্থিতিতে অনেক কৃষকই এখন কৃষিকাজ থেকে সরে গিয়ে তুলনামূলক কম কষ্টে উপার্জনের পথ বেছে নিচ্ছেন; কেউ কেউ টমটম চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। এতে হাওরের জমির পাশাপাশি বাড়ির আশপাশের অনেক জমিও পড়ে থাকছে বিনা চাষে, অনাবাদি অবস্থায়। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে একদিন এই উর্বর জনপদেই দেখা দিতে পারে খাদ্য উৎপাদনের ঘাটতি।
স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহল মনে করেন, হাইল হাওরকে ঘিরে সম্ভাবনার শেষ নেই। এখানে শুধু মাছ কিংবা ধান চাষই নয়, উপযুক্ত অবকাঠামো থাকলে হাঁস পালন, মুরগি পালন ও গরু মোটাতাজাকরণসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। বিস্তীর্ণ হাওরের প্রাকৃতিক ঘাস ও উন্মুক্ত পরিবেশে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন করা গেলে মানুষ পাবে সঠিক ও পুষ্টিকর খাদ্য। এ প্রসঙ্গে অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে দ্রুত মোটাতাজা করার জন্য কৃত্রিম প্যাকেটজাত ও বস্তাবন্দি খাদ্য খাইয়ে অল্প সময়ে মুরগি ও গরু বাজারজাত করা হচ্ছে; এসব মাংস খেয়ে দিন দিন নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন মানুষ। অথচ প্রাকৃতিক ঘাস আর প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব পালন করলে যেমন নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হতো, তেমনি হাওরপারের বেকার মানুষের কর্মসংস্থানও তৈরি হতো।
স্থানীয়রা মনে করেন, ‘যত জমি তত চাষ’—এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যদি কৃষকদের পাশে দাঁড়ায় এবং ধান, শাকসবজি ও মাছ চাষে যথাযথ উৎসাহ ও সহায়তা দেয়, তাহলে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়েও উদ্বৃত্ত উৎপাদন সম্ভব। কোন এলাকায় কী পরিমাণ সবজি, মাছ ও ধান উৎপাদন করা যায়—তার একটি বাস্তবভিত্তিক পরিমাপ করে সে অনুযায়ী কৃষকদের নানাভাবে সহযোগিতা করলে হাওরাঞ্চল আবারও ভরে উঠতে পারে ফসলে। পাশাপাশি কৃষক যেন তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পান, তা নিশ্চিত করাও জরুরি। তবে এসব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে সবার আগে দরকার অবকাঠামোগত সহায়তা—হাওরের ভেতরে ও আশপাশে চলাচলের উপযোগী রাস্তাঘাট, সেচের পানি ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। রাস্তাঘাট ভালো হলে কৃষক কম খরচে ও কম ভোগান্তিতে জমিতে পৌঁছাতে এবং ফসল বাজারজাত করতে পারবেন।
সব মিলিয়ে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর মৎস্যসম্পদের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত হাইল হাওরকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। দখল উচ্ছেদ, দেশীয় মাছের অভয়াশ্রম রক্ষা এবং কৃষি ও পশুপালনে যথাযথ সহায়তা—এই তিন দিকেই মৎস্য বিভাগ, কৃষি অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকাবাসী একযোগে এগিয়ে এলে হারিয়ে যাওয়া মাছ ও কৃষির হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা অসম্ভব নয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
