শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬
প্রচ্ছদ শিকারি থেকে বন্যপ্রাণীর রক্ষক: প্রকৃতির নিবেদিতপ্রাণ সেবক সীতেশ রঞ্জন দেব চিরনিদ্রায়

শিকারি থেকে বন্যপ্রাণীর রক্ষক: প্রকৃতির নিবেদিতপ্রাণ সেবক সীতেশ রঞ্জন দেব চিরনিদ্রায়

শাহাব উদ্দিন আহমদ, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি: দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ এবং বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সীতেশ রঞ্জন দেব আর নেই। মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল ৯টা ৫ মিনিটে ৭৫ বছর বয়সে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।

দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসসহ বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন সীতেশ রঞ্জন দেব। তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নাতি রাজদ্বীপ দেব। তিনি জানান, সকালে হঠাৎ শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। তবে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তিনি মারা যান।

তাঁর মৃত্যুতে শ্রীমঙ্গলসহ সারা দেশের পরিবেশবাদী ও বন্যপ্রাণীপ্রেমী মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রিয় ‘সীতেশ বাবু’র মৃত্যুর খবরে শ্রীমঙ্গলের সর্বস্তরের মানুষ শোক প্রকাশ করেছেন। খবর পেয়ে তাঁকে শেষবারের মতো দেখতে ও পরিবারকে সমবেদনা জানাতে ছুটে যান শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান।

মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের নোয়াগ্রামে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। শেষ বিদায় জানাতে উপস্থিত ছিলেন ইউএনও মো. জিয়াউর রহমান, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মহিবুল্লাহ আকন, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, সাংবাদিক, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাঁর মৃত্যুতে স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

সীতেশ রঞ্জন দেবের মৃত্যুতে এক শোকবার্তায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী। শোকবার্তায় তিনি প্রয়াতকে বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ রক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ, অসীম মমত্ববোধসম্পন্ন এক মানবিক ব্যক্তিত্ব এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের অগ্রসৈনিক হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি প্রয়াতের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজনের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

শ্রীমঙ্গল শহরের রামকৃষ্ণ মিশন রোডের বাসিন্দা সীতেশ রঞ্জন দেবের জীবনজুড়ে জড়িয়ে ছিল বন্যপ্রাণী আর প্রকৃতির গল্প। তাঁর বাবা শ্রীশচন্দ্র দেব ছিলেন এ অঞ্চলের নামকরা শিকারি ও পশুপাখির সেবক। বাবার হাত ধরেই কৈশোরে পশুপাখি লালনপালনে হাতেখড়ি হয় সীতেশের। এক সময় তিনি নিজেও দক্ষ শিকারি হয়ে ওঠেন এবং বন্দুক ব্যবহারের বৈধ লাইসেন্স নিয়ে লোকালয়ে উপদ্রব সৃষ্টিকারী বহু হিংস্র প্রাণী তাড়িয়েছেন কিংবা শিকার করেছেন।

কিন্তু শিকারি জীবনেই ঘটে যায় জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক ঘটনা। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে কুয়াশাঘেরা এক শীতের ভোরে ধলই ভ্যালির পাত্রখলা চা বাগানের নলখাগড়ার বনে বন্য শূকর তাড়াতে গিয়ে বিশাল আকৃতির একটি ভাল্লুকের আক্রমণের মুখে পড়েন তিনি। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে ভেতর থেকে বদলে দেয়। এরপর শিকার ছেড়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেন সীতেশ রঞ্জন দেব।

আহত, অসুস্থ ও বিপন্ন বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে তিনি নিজ বাড়ির আঙিনায় ছোট পরিসরে গড়ে তোলেন একটি সেবাকেন্দ্র। পর্যটক ও দর্শনার্থীদের কাছে ‘সীতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা’ নামে পরিচিতি পাওয়া এই কেন্দ্রটি পরবর্তীতে স্থান সংকুলান না হওয়ায় শহরসংলগ্ন খামারবাড়িতে স্থানান্তর করা হয় এবং সরকারি নিয়মনীতি অনুসরণ করে এটি রূপ নেয় ‘বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন’-এ।

গত কয়েক দশকে এই প্রতিষ্ঠান লোকালয়ে আটকে পড়া, দুর্ঘটনায় আহত কিংবা বিপন্ন হাজার হাজার বন্যপ্রাণীকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছে এবং সেগুলোকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন সংরক্ষিত বনে অবমুক্ত করেছে। পাশাপাশি বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্ধার অভিযানে নিয়মিত সহায়তা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বন্যপ্রাণী হত্যা ও পাচার প্রতিরোধে জনসচেতনতা তৈরিতেও রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

সীতেশ রঞ্জন দেব অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাঁর দুই ছেলে সজল দেব ও সঞ্জিত দেব বাবার আদর্শ অনুসরণ করে এই সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। স্বজনরা জানান, বাবার রেখে যাওয়া এই দায়িত্ব তাঁরা ভবিষ্যতেও চালিয়ে যাবেন।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, পাচার প্রতিরোধ ও পরিবেশ রক্ষায় সীতেশ রঞ্জন দেবের অসামান্য অবদান দেশের প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা