শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬
প্রচ্ছদ ভারী বৃষ্টিতে দিশেহারা দক্ষিণাঞ্চলের উপকুলবাসী

মৎস্য ও কৃষি খাতে প্রায় ১৪০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি

ভারী বৃষ্টিতে দিশেহারা দক্ষিণাঞ্চলের উপকুলবাসী

বি এম রাকিব হাসান, খুলনা: টানা বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে উপকুলীয়াঞ্চলে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে মৎস্য ও কৃষি খাতে ১৪০ কোটি ৫০ লাখ টাকারও বেশি আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ভেসে গেছে হাজার হাজার মাছের ঘের, তলিয়ে গেছে রোপা আমনের বীজতলা ও সবজির খেত।

টানা ভারী বর্ষণ ও বাঁধ ভেঙ্গে জোয়ারের পানির কারণে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর নিম্নাঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে সাতক্ষীরার আশাশুনি শ্যামনগর কালিগঞ্জ দেবহাটা ও খুলনার কয়রা দাকোপ পাইকগাছা এবং বাগেরহাটের রামপাল, মংলা, মোড়লগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় জনজীবন বিপর্যস্ত, কৃষিজমি জলমগ্ন এবং মৎস্য খাতের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

খুলনা বিভাগে সম্প্রতি ভারী বৃষ্টিপাতে মৎস্য ও কৃষি খাতের অন্তত ১৪০ কোটি ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মৎস্য খাতেই প্রায় ১২৬ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। কৃষিতে ক্ষতি হয়েছে ১৪ কোটি ৫০ লাখ টাকার। মৎস্য খাতে মোট ক্ষতির প্রায় ৭০ শতাংশই হয়েছে চিংড়িচাষিদের। এ ছাড়া কৃষিতে তরমুজচাষিরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মৎস্য অধিদপ্তর ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

খুলনা বিভাগের মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, টানা কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিতে বিভাগের ১০টি জেলার মধ্যে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়। বিভাগের ৪ হাজার ৭৬৪টি পুকুর এবং ২ হাজার ৮০৮টি দিঘি ও মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জাহাঙ্গীর আলম জানান, সাদা মাছচাষিরা ৭৩ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এ ছাড়া চিংড়ি খাতে ১৫ কোটি, মাছের পোনা খাতে ৯ কোটি এবং কাঁকড়া ও কুঁচিয়া খাতে ২৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। দেশের অন্যতম প্রধান চিংড়ি চাষের কেন্দ্রস্থল ডুমুরিয়া এলাকাটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। সেখানে প্রায় ৬৫০টি মৎস্য ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রায় ৮ কোটি ৬০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

এ মাসের প্রথম থেকে ধারাবাহিক অতি বৃষ্টিতে খুলনা বিভাগের চার জেলায় আট হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষকের আউস থেকে শুরু করে নানা ধরনের সবজি মাঠেই পচেছে। এসব জেলায় ৩৫ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলো হচ্ছে, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও নড়াইল।

ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলো হচ্ছে তেরখাদা, পাইকগাছা, ডুমুরিয়া, বটিয়াঘাটা, ফুলতলা, দিঘলিয়া, দাকোপ, বাগেরহাটের সদর, ফকিরহাট, মোল্লাহাট, কচুয়া, মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা, চিতলমারী, নড়াইল সদর, লোহাগড়া, কালিয়া ও সাতক্ষীরা জেলা সদর। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী এ মাসে আউস, আমন বীজতলা, তরমুজ, কাঁচামরিচ, পান, ঢেড়স, পুঁইশাক, ঝিঙে, উচ্ছে, বেগুন ও করোলা সবজি ক্ষেতেই পচেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খুলনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মোঃ রফিকুল ইসলাম মহাপরিচালকের দপ্তরে পাঠানো প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, এসব জেলায় ১৩ হাজার ৩২০ হেক্টর জমিতে নানা জাতের ফসলের মধ্যে ৩৮৬ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষেতে পচে যাওয়া ফসলের মূল্য ৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাগেরহাট জেলায়। এখানে প্রায় চার হাজার মহাজন চাষী, বর্গা, প্রান্তিক চাষী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শ্রাবণের শুরুতে অতিবৃষ্টির ফলে দিনমজুরদের পারিশ্রমিকের মজুরীও বেড়ে যায়। ক্ষেত্র বিশেষ সবজির দাম ১৫-২০ টাকা কেজিতে বেড়েছে। ডুমুরিয়া ও বটিয়াঘাটা থেকে সবজিবাহী ভ্যান ও ট্রলির ভাড়ার পরিমাণ দেড়গুণ বেড়েছে। কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্বল্প মূল্যে বেগুন, পটলসহ অন্যান্য সবজি বিক্রি করেছে। অতিবৃষ্টির কারণে শীতের সীম, লাউ, টমেটো বাজার আসতে বিলম্ব হবে।

দাকোপের ঘের ব্যবসায়ী আব্দুল হামিদ বলেন, টানা বৃষ্টিতে ঘেরের বাঁধ কয়েক জায়গায় ভেঙে গেছে। পানির ¯্রােতে অনেক মাছ বের হয়ে গেছে। এখন ঘেরে যা মাছ আছে, তাও ঠিকমতো থাকবে কি না বুঝতে পারছি না। প্রায় পাঁচ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছি। এর মধ্যে তিন থেকে চার লাখ টাকার ক্ষতি হবে। সরকার যদি আর্থিক সহায়তা দেয় এবং বাঁধ মেরামতের ব্যবস্থা করে, তাহলে কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে পারব।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) খুলনা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আজহার আলী বলেন, টানা অতিবৃষ্টিতে ঘের ও পুকুরের পানির লবণাক্ততা কমে যায়, পিএইচের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা হ্রাস পায়। ফলে বিশেষ করে চিংড়িসহ বিভিন্ন মাছ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এ পরিস্থিতিতে চাষিদের নিয়মিত পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণ করতে হবে। প্রয়োজনে চিংড়িঘেরে পাথরের চুন (ক্যালসিয়াম কার্বোনেট) ব্যবহার এবং বাঁধ ও ঘেরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে মাছের সাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

 

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা