শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬
প্রচ্ছদ খুলনাঞ্চলে অভিযানেও থেমে নেই মাদক বেচা কেনা: গডফাদাররা ধরা ছোয়ার বাইরে

খুলনাঞ্চলে অভিযানেও থেমে নেই মাদক বেচা কেনা: গডফাদাররা ধরা ছোয়ার বাইরে

বি এম রাকিব হাসান, খুলনা থেকে : খুলনায় মাদক কারবারিদের বিস্তার এবং গডফাদারদের আড়ালে থাকা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও সুশীল সমাজের মধ্যে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযানের ফলে প্রায়ই খুচরা বিক্রেতা বা মাদক বহণকারীরা গ্রেপ্তার হলেও, নেপথ্যের মূল অর্থদাতা বা গডফাদাররা প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ে বা কৌশলগত কারণে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিভাগীয় শহর খুলনায় মাদকের ভয়াবহতা, বিশেষ করে ইয়াবা ট্যাবলেটের বিস্তার আশঙ্কাজনক রূপ ধারণ করেছে। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এবং মাঝে মাঝে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযানের পরও থামানো যাচ্ছে না এই মরণনেশার জোয়ার। খুলনা মহানগরী থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এখন সহজলভ্য হয়ে উঠেছে ইয়াবা, যা স্থানীয় যুবসমাজকে ঠেলে দিচ্ছে এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, খুলনায় ইয়াবা আসার প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে পাশ্ববর্তী সীমান্তবর্তী এলাকা এবং নদীপথ। কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম থেকে দূরপাল্লার বাস, ট্রাক ও কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে অভিনব কায়দায় ইয়াবার বড় বড় চালান খুলনায় এসে পৌঁছায়। এছাড়া সাতক্ষীরা ও যশোর সীমান্ত দিয়েও ইয়াবার চোরাচালান খুলনার বাজারগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে। চালানের নিরাপত্তা দিতে মাদক কারবারিরা নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করছে, যার কারণে অনেক সময় তল্লাশি চালিয়েও এদের ধরা কঠিন হয়ে পড়ে।

খুলনা মহানগরীর খালিশপুর, দৌলতপুর, রূপসা ঘাট, সোনাডাঙ্গা, লবনচরা এবং রূপসা সেতু সংলগ্ন এলাকাগুলো ইয়াবা কেনাবেচার প্রধান স্পট হিসেবে চিহ্নিত। তবে শুধু নিম্নবিত্ত বা বস্তি এলাকাতেই নয়, নগরীর সোনাডাঙ্গা আড়ংঘাটা বা নিরালার মতো অভিজাত এলাকার উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরাও এই মরণনেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এখন ইয়াবা সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়েছে। প্রথম দিকে কৌতূহল থেকে শুরু করলেও পরবর্তীতে তারা নিয়মিত মাদকসেবীতে পরিণত হচ্ছে।

ইয়াবার এই মরণছোবলের সরাসরি প্রভাব পড়ছে খুলনার আইনশৃঙ্খলার ওপর। মাদক কেনার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে আসক্ত তরুণ-তরুণীরা জড়িয়ে পড়ছে চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন গ্যাং কালচারের সাথে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের ভেতরের জমানো টাকা বা গয়না চুরি করার ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত। ইয়াবাসক্ত সন্তানদের কারণে খুলনার শত শত পরিবারে প্রতিদিন অশান্তি ও কলহ লেগেই রয়েছে, যা অনেক সময় খুন বা আত্মহত্যার মতো জঘন্য অপরাধে রূপ নিচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, খুলনায় ইয়াবা ব্যবসার পেছনে রয়েছে একটি শক্তিশালী প্রভাবশালী চক্র। মাঠপর্যায়ে কিছু চুনোপুঁটি বিক্রেতা বা ‘খুচরা কারবারি’ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়লেও, পর্দার আড়ালে থাকা মূল হোতা বা গডফাদাররা সব সময়ই অধরা থেকে যায়। রাজনৈতিক প্রভাব এবং বিপুল অর্থের জোরে এই গডফাদাররা তাদের সিন্ডিকেট টিকিয়ে রেখেছে। তারা উঠতি বয়সী তরুণ ও নারীদের ‘ডেলিভারি এজেন্ট’ বা বাহক হিসেবে ব্যবহার করছে, যাতে নিজেরা নিরাপদ থাকা যায়।

খুলনার বিশিষ্ট নাগরিক ও সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ইয়াবার মরণছোবল থেকে খুলনাকে রক্ষা করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন পারিবারিক সচেতনতা। সন্তানদের চলাফেরা ও বন্ধু মহলের ওপর অভিভাবকদের কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। একই সাথে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও তথ্যনির্ভর ও কঠোর অভিযান পরিচালনা করে খুচরা বিক্রেতাদের পাশাপাশি মূল অর্থ জোগানদাতা ও গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে হবে। যুবসমাজকে রক্ষা করতে না পারলে খুলনার সামগ্রিক উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতি হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন বলেন, খুলনায় ইয়াবার আগ্রাসন ভয়াবহ রুপ নিয়েছে। ব্যবসায়ীরা নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করছে। পুলিশ ইয়াবা ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারের অভিযান চালিয়েও এদের নিয়ন্ত্রন করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, খুলনায় বেকার সমস্যাই ইয়াবা ব্যবসাকে সম্প্রসারিত করেছে। ইয়াবা ব্যবসায় লাভ বেশি তাই বেকার যুব সমাজ এই ব্যবসায় নামছেন। পুলিশ কমিশনার বলেন ইয়াবা নয়; সকল মাদক ব্যবসা নির্মুলে পুলিশ কাজ করছে।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা