শাহাব উদ্দিন আহমদ, শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধিঃ মৌলভীবাজার-৩ (সদর-রাজনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এম নাসের রহমানকে নিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া, বিকৃত ও অশ্লীল ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা সাইবার মামলায় এক আসামিকে গ্রেফতার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
গ্রেফতার হওয়া আসামির নাম সৈয়দ তানভীর আহমেদ (৩০)। সোমবার (৩ আগস্ট) রাত আনুমানিক নয়টার দিকে শ্রীমঙ্গল উপজেলা থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর পূর্বের বাড়ি জুড়ী উপজেলায়। মৌলভীবাজার পৌরসভার বেরিরপাড় এলাকায় তাঁর ব্যবসায়িক ফার্ম রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন এবং তিনি নিজেকে একটি ফার্মের প্রকৌশলী হিসেবে পরিচয় দেন। বর্তমানে তিনি শ্রীমঙ্গল উপজেলার আশিদ্রোন এলাকায় বসবাস করছিলেন।
মৌলভীবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, ডিবি পুলিশ অভিযান চালিয়ে ওই আসামিকে গ্রেফতার করেছে। মামলাটি বর্তমানে ডিবি পুলিশ তদন্ত করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, এমপি এম নাসের রহমানের সুনাম ক্ষুণ্ন ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তি নষ্ট করার উদ্দেশ্যে একটি মহল দীর্ঘদিন ধরে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তাঁর ছবি ব্যবহার করে ভুয়া, বিকৃত ও অশ্লীল ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করে আসছে। এ ঘটনায় গত ২ আগস্ট মৌলভীবাজার সদর মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন অ্যাডভোকেট নিয়ামুল হক (৩৮)।
অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, ১ আগস্ট সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে মৌলভীবাজার পৌরসভার সৈয়ারপুর স্কুল রোড এলাকার নিজ বাসায় অবস্থানকালে মোবাইল ফোনে ফেসবুকে প্রবেশ করে তিনি দেখতে পান, বিভিন্ন ফেসবুক আইডি থেকে এমপি নাসের রহমানের ছবি ব্যবহার করে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি একটি বিকৃত ও অশ্লীল ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে। এজাহারে অভিযোগ করা হয়, এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে এমপির মাথার ছবি সম্পাদনা করে অন্য একজন ব্যক্তির শরীরের সঙ্গে যুক্ত করে ওই ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে তাঁকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হয়েছে।
অভিযোগে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে আরও ২৫ থেকে ৩০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারে বলা হয়, আসামিদের ব্যবহৃত বিভিন্ন ফেসবুক আইডি থেকে ভিডিওটি পোস্ট, শেয়ার ও প্রচার করা হয়েছে এবং সেসব আইডির তথ্যও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘VOICE TV২৪’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকেও ভিডিওটি প্রচারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ভিডিওটি তৈরি ও প্রচারের পেছনে বেআইনি সুবিধা আদায় ও ব্ল্যাকমেইলের উদ্দেশ্য থাকতে পারে। আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ভবিষ্যতেও এ ধরনের ভিডিও তৈরি ও প্রচার করতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানানো হয়।
মৌলভীবাজার সদর মডেল থানায় অভিযোগ গ্রহণের পর মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয় জেলা গোয়েন্দা পুলিশকে। তদন্তের অংশ হিসেবেই সোমবার রাতে শ্রীমঙ্গল থেকে সৈয়দ তানভীর আহমেদকে গ্রেফতার করা হয় বলে নিশ্চিত করেছেন মৌলভীবাজার ডিবি পুলিশের ওসি সুদীপ্ত শেখর ভট্টাচার্য। তিনি জানান, গ্রেফতার আসামিকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। প্রয়োজনে তাঁকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, তদন্তেই বেরিয়ে আসবে কারা এ ঘটনায় জড়িত।
মামলার বাদী মৌলভীবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (অতিরিক্ত পিপি) অ্যাডভোকেট নিয়ামুল হক জানান, প্রচলিত সাইবার আইনে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কারও বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ বা বিকৃত কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া গুরুতর ও দণ্ডনীয় অপরাধ। অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
উল্লেখ্য, এমপি এম নাসের রহমানকে নিয়ে এআই প্রযুক্তিতে তৈরি ভুয়া ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানোর ঘটনা এটিই প্রথম নয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গত জানুয়ারিতেও এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি একটি ভুয়া ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে তাঁকে বিতর্কিত রাজনৈতিক বক্তব্যে জড়ানোর অপচেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেছিলেন এবং ভোটারদের বিভ্রান্ত না হয়ে তথ্য যাচাই করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। সর্বশেষ গত ১ আগস্ট নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানান, রাজনৈতিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে তাঁর মাথার ছবি অন্য একজনের শরীরে বসিয়ে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ভুয়া ও অশ্লীল ভিডিও তৈরি ও প্রচার করা হচ্ছে। ওই বার্তায় তিনি যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর এআই-নির্মিত ভিডিও, ছবি বা তথ্য শেয়ার ও প্রচার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান এবং এ ধরনের কনটেন্ট পুনঃপ্রচারও আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ বলে সতর্ক করেন।
বাদী ও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, কেবল মূল ভিডিও নির্মাণকারীই নন, যাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই অপপ্রচারমূলক ভিডিও পোস্ট, শেয়ার কিংবা তাতে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছেন, তাঁদের সবাইকেই এ মামলার আসামির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
