শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ খুলনাঞ্চলে অসময়ের তরমুজ চাষে কৃষকের নতুন বিপ্লব

খুলনাঞ্চলে অসময়ের তরমুজ চাষে কৃষকের নতুন বিপ্লব

বি এম রাকিব হাসান, খুলনা: মাছের ঘেরের ভেড়ি বা পাড়ে অফ-সিজন (অমৌসুমি) তরমুজ চাষ বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষকদের জন্য একটি অত্যন্ত লাভজনক এবং নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। সাধারণত বর্ষাকালে বা বছরের অন্য সময়ে যখন ঘেরের পাড়গুলো খালি পড়ে থাকে, তখন আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে সেখানে উচ্চমূল্যের তরমুজ চাষ করা হচ্ছে।

ঘেরের অনাবাদি আইল বা ভেড়ির খালি জায়গা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়। বর্ষাকালে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ার কারণে আলাদা করে সেচ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না, যা খরচ অনেক কমিয়ে দেয়। অফ-সিজনে বাজারে তরমুজের সরবরাহ কম থাকে, তাই কৃষকরা প্রতি কেজি তরমুজ ৬০ থেকে ৭০ টাকা বা তারও বেশি পাইকারি মূল্যে বিক্রি করতে পারেন। লাউ বা মিষ্টি কুমড়ার মতো খুব সহজেই মাচা তৈরি করে এই তরমুজ চাষ করা সম্ভব। অফ-সিজনে চাষের জন্য সাধারণত হাইব্রিড জাতের বারোমাসি তরমুজ বেছে নেওয়া হয়। এর মধ্যে ব্ল্যাকবক্স, তৃপ্তি, স্মার্ট বয়, মিম আস্থা, কালমানিক এবং রংগিলা জাতগুলো বেশ জনপ্রিয়। ঘেরের পাড়ে তরমুজের বীজ রোপণ বা চারা রোপণের পর গাছ বড় হলে বাঁশ ও জাল দিয়ে মাচা তৈরি করা হয়।

ফলগুলো যাতে মাটিতে বা পানিতে পড়ে নষ্ট না হয়, সেজন্য মাচায় জাল বা নেটের ব্যাগ দিয়ে তরমুজ ঝুলিয়ে রাখা হয়। মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং আগাছা পরিষ্কার রাখার জন্য অনেকে মালচিং পেপার (এক ধরণের প্লাস্টিক শিট) ব্যবহার করে চাষ করেন। চারা রোপণের মাত্র ৬০ থেকে ৬৫ দিনের মধ্যেই এই তরমুজ বিক্রির উপযোগী বা পরিপক্ক হয়ে ওঠে। খুলনার বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়া, পাইকগাছা, রূপসা এবং নড়াইল ও সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে এই চাষ দিন দিন ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে বটিয়াঘাটা উপজেলায় প্রায় ৬৫০ হেক্টর জমিতে অফ-সিজন তরমুজ চাষ হয়েছিল। এ বছর কৃষকদের বাড়তি আগ্রহ ও সম্ভাবনাময় ফলনের কারণে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে। চলতি মৌসুমে উপজেলার প্রায় ৮০০ হেক্টর জমিতে অফ-সিজন তরমুজ চাষ করা হয়েছে।

প্রচলিত মৌসুমে বিলের জমিতে তরমুজ চাষ করা হলেও অফ-সিজনে বটিয়াঘাটায় দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। মাছের ঘেরের ভেড়িতে তরমুজের বীজ রোপণ করে জাল দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে মাচা। গাছগুলো জাল বেয়ে ওপরে উঠে ছড়িয়ে পড়ছে এবং সেখানেই ঝুলে বড় হচ্ছে তরমুজ। নিচে চলছে মাছ চাষ, আর ঘেরের ওপরের অংশে উৎপাদিত হচ্ছে তরমুজ। একই জায়গার এমন বহুমুখী ব্যবহারে বাড়তি আয়ের সম্ভাবনা দেখছেন কৃষকরা।

কৃষকদের মতে, তরমুজ চাষে সেচের জন্য পানির ব্যবস্থা অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। তবে বর্ষা মৌসুমে নিয়মিত বৃষ্টির কারণে কৃষকদের এ সমস্যায় পড়তে হচ্ছে না। ঘেরের ভেড়ি ব্যবহার করায় আলাদা করে বড় জমি প্রস্তুতের প্রয়োজনও কম হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ কমিয়ে লাভের আশা করছেন কৃষকরা।

সূত্রমতে, লোনা জলের প্রতিকূলতা জয় করে খুলনা পাইকগাছার ৫নং সোলাদানা ইউনিয়নে তরমুজের ‘অফ-সিজন’ বা অসময়ের চাষাবাদে নতুন বিপ্লব ঘটছে। ঘেরের অনাবাদি আইল বা ভেড়িকে কাজে লাগিয়ে অফ-সিজনে তরমুজসহ বিভিন্ন সবজি ফলিয়ে দারুণ সাফল্যের মুখ দেখছেন স্থানীয় কৃষকেরা। উপজেলা কৃষি অফিসের দিকনির্দেশনায় চলতি মৌসুমে ইউনিয়নের প্রায় ১৫০ বিঘা জমিতে ব্যাপকভাবে শুরু হয়েছে এই আধুনিক ও লাভজনক কৃষি কার্যক্রম।

স্থানীয় কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, সোলাদানা ইউনিয়নে বছরে প্রায় আট মাস লবণাক্ত পানি থাকায় সাধারণ ফসল ফলানো বেশ কঠিন। আর মাত্র চার মাস মিষ্টি পানির উপস্থিতি থাকে। এই চার মাসের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে তিন বছর আগে সোলাদানা ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল্লাহর উদ্যোগে পরীক্ষামূলকভাবে ভেড়িতে তরমুজ চাষের পরিকল্পনা করা হয়। গত বছর ইউনিয়নের প্রায় ৭৫ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ হলেও এবার তা দ্বিগুণ বেড়ে ১৫০ বিঘা জমিতে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে ছালুবুনিয়া, খালিয়াচক, টেংরামারী (মাস্টারপাড়া), নায়েবখালী, পূর্ব দীঘা, দক্ষিণ কাইনমুখী ও বেতবুনিয়া গ্রামের মাঠজুড়ে চলছে পরিচর্যার কাজ। ঘেরের আইলে বাঁশের মাচায় সবুজ লতা ছড়িয়ে পড়ছে।

নায়েবখালী গ্রামের কৃষক বাদল জানান, গত বছর মাত্র এক বিঘা জমিতে পরীক্ষামূলক তরমুজ চাষ করে মাত্র ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা খরচে প্রায় ৮৫ হাজার টাকার তরমুজ বিক্রি করেছিলেন। খালিয়াচকের হিমাংশু ও পলাশ সহ অনেক কৃষকই এখন বাণিজ্যিকভাবে এই চাষে ঝুঁকছেন। এমনকি তরমুজের পাশাপাশি পুঁইশাক, শসা, মিষ্টি কুমড়া ও উচ্ছে চাষ করে এক একজন কৃষক প্রায় ৭ লক্ষ টাকা আয়ের স্বপ্ন দেখছেন।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা