রবিবার | সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশঢাকা সাভার-আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে মেশিন-শ্রমিক সবই আছে, নেই নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ

সাভার-আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে মেশিন-শ্রমিক সবই আছে, নেই নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ

ফাহাদ-ই-আজম : সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নতুন করে বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানায় মেশিন পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। অন্যদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন সচল রাখতে ব্যবহার করতে হচ্ছে ডিজেল, সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি। এতে উৎপাদন কমার পাশাপাশি বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বিদেশি ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ ও জাহাজীকরণ নিয়ে।

সোমবার ও মঙ্গলবার সাভার-আশুলিয়ার বিভিন্ন পোশাক, ওয়াশিং ও সুতা কারখানা ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

কারখানাভিত্তিক উৎপাদন পরিস্থিতি

০১. সাভার গ্লোবাল আউটার ওয়্যার
দৈনিক ৩০ টন উৎপাদন থেকে কমে হয়েছে মাত্র ১১ টন।

০২. ম্যাক্সকম ইন্ডাস্ট্রিজ বিডি
হেমায়েতপুরের এ কারখানায় দৈনিক পোশাক উৎপাদন ২০ হাজার পিস থেকে নেমে এসেছে প্রায় ৫ হাজার পিসে।

০৩. ফৌজিয়া ও ফাহিম ফ্যাশন
স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য অন্তত ৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন হলেও পাওয়া যাচ্ছে ১ থেকে ২ পিএসআই। বিকল্পভাবে সিলিন্ডারে গ্যাস সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

০৪. জিরাবোর ওয়াশিং ও ডাইং কারখানা
প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ ১০ পিএসআই হলেও বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে ১ থেকে ২ পিএসআই। দৈনিক উৎপাদন ৪৫-৫০ হাজার পিস থেকে কমে হয়েছে ২৫-৩০ হাজার পিস। ৮০-৯০টি মেশিন একসঙ্গে চালানো যাচ্ছে না। বাইরে থেকে গ্যাস এনে উৎপাদন চালাতে প্রতি ঘণ্টায় অতিরিক্ত ৩০-৩৫ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে।

০৫. ফান ফ্যাক্টরি
আগে জেনারেটর চালাতে যেখানে প্রায় ৫ হাজার টাকার ডিজেল লাগত, এখন খরচ হচ্ছে প্রায় ১৫ হাজার টাকা। প্রতিদিন ৫-৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।

০৬. লিটল স্টার স্পিনিং মিল
গ্যাস, বিদ্যুৎ, সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি মিলিয়ে রেশনিং করে উৎপাদন চলছে। কারখানাটি প্রায় ৪০ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে হিমশিম খাচ্ছে। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। প্রতি পাউন্ড সুতা উৎপাদনে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে ১৪-১৫ টাকা।

০৭. রিং শাইন টেক্সটাইল লিমিটেড
ডিইপিজেডের এ কারখানায় দৈনিক ৩০-৩৫ হাজার টন সুতা উৎপাদনের বিপরীতে এখন উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ৭-১০ হাজার টনে।

০৮. প্রীতি কম্পোজিট
দৈনিক ওয়াশিংয়ের পরিমাণ ৬০ টন থেকে কমে হয়েছে প্রায় ৪০ টন।

০৯. আশেয়া ক্লথিং
দৈনিক ৮০ হাজার পিস উৎপাদন থেকে কমে এখন প্রায় ৫০ হাজার পিসে দাঁড়িয়েছে।

১০. ফ্যাশন ফোরাম
দৈনিক উৎপাদন ২০ হাজার পিস থেকে নেমে এসেছে প্রায় ৯ হাজার পিসে।

১১. গোল্ডেন অ্যাটায়ার্স ফ্যাশন লিমিটেড
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে অর্ডারের পণ্য প্রস্তুতে দেরি হচ্ছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে শিপমেন্ট নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

১২. প্রতীক সিরামিক
দৈনিক ৮০ হাজার পিস উৎপাদন সক্ষমতার বিপরীতে বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ২০ হাজার পিস।

১৩. মুন্নু সিরামিক
দৈনিক প্রায় ২০ হাজার পিস উৎপাদন থেকে কমে বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১০ হাজার পিস।

শিল্পাঞ্চলে সামগ্রিক প্রভাব

শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর তথ্য অনুযায়ী, সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাইয়ে তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্যসহ বিভিন্ন খাতের মোট ১ হাজার ৮৬৩টি শিল্পকারখানা রয়েছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে কারখানাগুলো পুরোপুরি বন্ধ না হলেও উৎপাদনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কোথাও মেশিন বন্ধ রেখে রেশনিং করা হচ্ছে, কোথাও বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন ধরে রাখার চেষ্টা চলছে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে রপ্তানি আদেশের সময়সীমা নিয়ে। নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন শেষ করতে না পারলে পণ্য জাহাজীকরণে বিলম্ব হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা এবং ভবিষ্যৎ ক্রয়াদেশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা।

শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাইয়ে গ্যাস সংকটের কারণে কোনো কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে উৎপাদন কমেছে। লোডশেডিংয়ের কারণে অনেক কারখানায় জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে গড়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদন কমেছে।

ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর মহাব্যবস্থাপক আখতারুজ্জামান লস্কর বলেন, সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৪৭০ থেকে ৪৮০ মেগাওয়াট। বর্তমানে ঘাটতি রয়েছে প্রায় ১০০ মেগাওয়াট। ফলে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। তবে ১০ দিন আগের তুলনায় পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, গ্যাসের সংকটের কারণে বিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। গ্যাস না থাকায় রান্নাসহ বিভিন্ন কাজে বিদ্যুৎনির্ভর যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। এতে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে।

তিতাস গ্যাসের আশুলিয়া জোনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রকৌশলী আবু ছালেহ মুহাম্মদ খাদেমুদ্দীন বলেন, গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা বলেন, অনেক কারখানায় ২৪ ঘণ্টা তো দূরের কথা, টানা সাত-আট ঘণ্টাও নিরবচ্ছিন্নভাবে উৎপাদন চালানো যাচ্ছে না। এতে বিদেশি ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ ও জাহাজীকরণ নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতের ক্রয়াদেশও এ পরিস্থিতির কারণে প্রভাবিত হতে পারে।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা