বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা : রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে ভাড়ায় নেওয়া ইজি বাইক, নগদ ধার নেওয়া টাকা এবং বিভিন্ন ঋণের বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করে আত্মগোপনে যাওয়া ইজি বাইক চালক মোঃ ইসমাইল হোসেনকে (২৭) আটকের পর বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর ও বিস্ময়কর সব তথ্য। ইজি বাইক বিক্রি ও আত্মসাৎ করা অর্থ নিজের বাবা, রক্ষা ও স্বজনদের কাছে গচ্ছিত রাখার কথা স্বীকার করেছেন অভিযুক্ত ও তার স্ত্রী। এমনকি প্রতারণা ও পাওনা টাকা ফাঁকি দেওয়ার বিষয়ে লিখিত স্টাম্পে লিখিত অঙ্গীকারনামা ও জামিননামার তথ্যও উদঘাটিত হয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও অর্থ আত্মসাৎ
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ভোলা জেলার চর ফ্যাশন থানার উত্তর চর মনিকা গ্রামের (ডাকঘর: দক্ষিণ আইচা-৮৩৪০) মোঃ আব্দুল করিম বেপারী ও হালিমা বেগমের ছেলে মোঃ ইসমাইল হোসেন (জাতীয় পরিচয়পত্র নং- ১৯৭৭৯১০২৬২) গত তিন বছর ধরে যাত্রাবাড়ীর মৃধাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা ভুক্তভোগী মোঃ মিঠু (৩২)-এর কাছ থেকে ভাড়ায় ইজি বাইক চালিয়ে আসছিলেন। ভুক্তভোগী মোঃ মিঠু (পিতা: মোঃ মাহে আলম, মাতা: সেফু বেগম, গ্রাম: দক্ষিণ জয়নগর, দৌলতখান, ভোলা; এনআইডি নং- ৪২০৬০৯০৫৫৯) ইসমাইলের পূর্ব পরিচয়ের সূত্রে তাকে বিশ্বাস করে নগদ ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা ধার দেন।
এছাড়া মিঠুকে জামিনদার (গ্যারান্টর) রেখে ইসমাইল ব্যবসায়িক সমিতি থেকে ২০ হাজার টাকা এবং ‘আশা’ এনজিও/সমিতি থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করেন। অন্যদিকে, মোঃ রবিউল ইসলাম (পিতা: মোঃ নুরুল ইসলাম, মাতা: ফিরোজা বেগম, ঠিকানা: মৃধাবাড়ী শামসুল ফার্মেসী সংলগ্ন, মাতুয়াইল) নামে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বিগত ০১/০১/২০২৬ তারিখে ব্যবসায়িক লভ্যাংশের চুক্তিতে ১,০০,০০০ (এক লক্ষ) টাকা এবং অন্যান্য পরিচিত লোকজনের কাছ থেকে আরও ৫,০০,০০০ (পাঁচ লক্ষ) টাকা ঋণ হিসেবে গ্রহণ করেন ইসমাইল। উক্ত ৬ লক্ষ টাকার ঋণের জামিনদারও ছিলেন মোঃ মিঠু।
সবমিলিয়ে ইজি বাইকসহ মোট বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে গত ১৯ জুন ভোরে হুট করেই উধাও হয়ে যান চালক ইসমাইল হোসেন। পাওনাদারদের পাওনা টাকার জন্য জামিনদার মিঠুর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হলে মিঠু বাধ্য হয়ে নিজের ব্যবসার মালিকানাধীন ৫টি অটো গাড়ি (ইজি বাইক) এবং দোকানের মালামাল বিক্রি করে পাওনাদারদের টাকা পরিশোধ করেন। ফলে ইসমাইলের কারণে মিঠু নিজেই সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন এবং ইসমাইলের কাছে মোট ৬,০০,০০০ (ছয় লক্ষ) টাকা পাওনা হন।
লিখিত অঙ্গীকারনামা ও স্টাম্পের জালিয়াতি
পরবর্তীতে অভিযুক্ত ইসমাইলকে খুঁজে বের করে পাওনা টাকা আদায়ের মুখে মুখোমুখি করা হলে গত ২৭/০৮/২০২৬ ইং তারিখে তিন ফর্দের ১০০ টাকা মূল্যমানের নন-জুডিশিয়াল স্টাম্পে (স্টাম্প নং: গড ৬২৫২১১০, গড ৬২৫২১১১, গড ৬২৫২১১২) একটি ‘পাওনা টাকা ফেরত দানের স্বীকারোক্তি/অঙ্গীকার নামা’ সম্পাদনা করা হয়।
উক্ত দলিলে ইসমাইল হোসেন স্বীকার করেন যে, আগামী ২৭/০৮/২০২৬ ইং তারিখ হতে ২৬/০৮/২০২৭ ইং তারিখের মধ্যে তিনি মোঃ মিঠুর পাওনা সর্বমোট ৬,০০,০০০/- (ছয় লক্ষ) টাকা ধাপে ধাপে পরিশোধ করবেন। ব্যর্থ হলে তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও নিলামের মাধ্যমে টাকা আদায়ের আইনানুগ অধিকার মিঠুকে প্রদান করা হয়। উক্ত দলিলে ইসমাইলের স্ত্রী মোসাম্মৎ আয়েশা (পিতা: মনজত আলী সরদার, জন্ম তারিখ: ২০০৮০৯১২৫৮৮১৪২৭৪৭) নিজেকে একক ‘জামিনদার’ হিসেবে ঘোষণা করে অঙ্গীকার করেন যে, স্বামী টাকা পরিশোধ না করলে তিনি নিজ দায়িত্বে উক্ত ৬ লক্ষ টাকা পরিশোধে বাধ্য থাকিবেন।
আটক ও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য
ঘটনার পর ভুক্তভোগী মোঃ মিঠু যাত্রাবাড়ী থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করলে পুলিশ অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত ইসমাইল হোসেনকে আটক করে। আটকের পর পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ ও স্বীকারোক্তিতে ইসমাইল জানান, তিনি ভাড়ায় নেওয়া ইজি বাইকটি বিক্রি করে দিয়েছেন এবং বিক্রি করা অর্থ ও আত্মসাৎ করা নগদ টাকা নিজের বাবা আব্দুল করিম বেপারী ও চাচার কাছে জমা রেখে দিয়েছেন।
অন্যদিকে, ইসমাইলের স্ত্রী মোসাম্মৎ আয়েশা জানান, আত্মসাৎকৃত টাকার একটি বড় অংশ তার ভাই (ইসমাইলের শ্যালক) সৈয়দ আলীর নিকটে গচ্ছিত রাখা হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, স্বজনরা এই টাকা ফেরত দিলেই ভুক্তভোগী মিঠু তাদের রেহাই দেবেন।
ভুক্তভোগী ও পুলিশের বক্তব্য
ভুক্তভোগী মোঃ মিঠু এ বিষয়ে বলেন, “আমি বিশ্বাস করে তাকে আশ্রয় ও ঋণ পাইয়ে দিতে সাহায্য করেছিলাম। সে আমার জীবন ছারখার করে দিয়েছে। আমার পাওনা মোট টাকার অন্তত তিন ভাগের এক ভাগ নগদ ফেরত দিলে এবং বাকি টাকা পরিশোধের জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সীমা দিলে আমি বিষয়টি মানবিক বিবেচনায় নেব এবং মামলা-অভিযোগ থেকে তাদের রেহাই দেব।”
যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী আত্মসাৎ করা টাকা ও বিক্রিত ইজি বাইক উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
