বৃহস্পতিবার | সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ শ্রীমঙ্গলে ছড়া লুটের নেপথ্যে অধরাই থেকে যাচ্ছে বালু সিন্ডিকেট

ভোরের ছদ্মবেশী অভিযানে ধরা দুই, তিন মাসের কারাদণ্ড

শ্রীমঙ্গলে ছড়া লুটের নেপথ্যে অধরাই থেকে যাচ্ছে বালু সিন্ডিকেট

শাহাব উদ্দিন আহমদ, শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধিঃ মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় পরিবেশ বিধ্বংসী অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। তিন ঘণ্টাব্যাপী পরিচালিত এ অভিযানে হাতেনাতে আটক দুইজনকে তিন মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৬টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত উপজেলার উদনা ছড়া, লাংলিয়া ছড়া ও ডিংডিংগিয়া ছড়ার গোলগাঁও, সিক্কা ও খারিজ্জমা এলাকায় একযোগে এ ঝটিকা অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানের নেতৃত্ব দেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মিনহাজুল ইসলাম। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা করে শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশের একটি চৌকস দল।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিনহাজুল ইসলাম জানান, অভিযানের তথ্য গোপন রাখতে এবং বালুখেকোদের আগেভাগে সতর্ক হওয়ার সুযোগ না দিতে বিশেষ কৌশল নেওয়া হয়। সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ছদ্মবেশে একটি অগ্রগামী দলকে আগে এলাকা পরিদর্শনে পাঠানো হয়। তবে প্রশাসনের মূল দলের উপস্থিতি টের পেয়ে ছড়ার অপর প্রান্ত দিয়ে কয়েকজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পরে সাইটুলা গ্রামের ডিংডিংগিয়া ছড়া থেকে বালু উত্তোলনরত অবস্থায় দুই যুবককে হাতেনাতে আটক করা হয়।

দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—শ্রীমঙ্গল উপজেলার দক্ষিণ সাইটুলা গ্রামের বলরাম কুর্মীর ছেলে সিপেন কুর্মী (২৮) এবং একই গ্রামের কুশল কুর্মীর ছেলে বিশ্বনাথ কুর্মী (২৬)। ঘটনাস্থলেই ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনে পৃথক দুটি মামলায় তাঁদের প্রত্যেককে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংস করে নদী ও ছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। তিনি জানান, কেবল মাঠপর্যায়ের শ্রমিকদের ওপর নজর না রেখে এই সিন্ডিকেটের পেছনে থাকা প্রভাবশালী মূল হোতাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি প্রক্রিয়ায় আনা হচ্ছে।

ইউএনও আরও জানান, গত তিন মাসে এ চক্রের বিরুদ্ধে তিনটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে, যেগুলো বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। এর আগের দিন ১০ হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। “এই অবৈধ চক্রকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল না করা পর্যন্ত আমাদের কঠোর পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে,” বলেন তিনি।

পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় এ ধরনের ঝটিকা অভিযান ও সার্বিক নজরদারি অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। একই সঙ্গে অবৈধ বালু উত্তোলনের খবর পাওয়ামাত্র প্রশাসনকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে সচেতন স্থানীয় নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

তবে প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযানের পরও নামে-বেনামে বালু উত্তোলন থামছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রকাশ্যে রাস্তার পাশে স্তূপ করে রেখে বালু লোড-আনলোড চলছে; রাতের আঁধারে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে রাতের মধ্যেই তা পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন গন্তব্যে। নামমাত্র জরিমানা ও স্বল্পমেয়াদি কারাদণ্ডে এ তৎপরতা থামানো যাচ্ছে না বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে। তাঁদের ভাষ্য, অভিযানে বরাবরই ধরা পড়ছেন মাঠপর্যায়ের শ্রমিকেরা, অথচ মূল ব্যবসায়ীরা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ ধরনের দণ্ডকে তাঁরা ব্যবসার খরচ হিসেবেই ধরে নিচ্ছেন বলে অনেকের ধারণা।

বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞজনেরা মনে করেন, অবৈধ বালু ব্যবসা বন্ধ করতে হলে কেবল অভিযান নয়, প্রয়োজন কঠোর ও ধারাবাহিক নিয়ন্ত্রণ এবং এমন মাত্রার আর্থিক দণ্ড, যাতে অপরাধী পুনরায় এ কাজে জড়াতে সাহস না পান। সেই সঙ্গে সিন্ডিকেটের অর্থদাতা ও পরিবহন-নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে আইনের আওতায় না আনা পর্যন্ত ছড়া ও নদী থেকে বালু লুট পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হবে না বলেও তাঁদের অভিমত।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা