বুধবার | সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশঢাকা কলঙ্ক নয়, সহমর্মিতাই মাদকমুক্ত জীবনের পথ : মোহিত কামাল

কলঙ্ক নয়, সহমর্মিতাই মাদকমুক্ত জীবনের পথ : মোহিত কামাল

মো. ইলিয়াছ মাহমুদ : মাদকাসক্তি থেকে সেরে ওঠার ক্ষেত্রে সামাজিক কলঙ্ক নয়, প্রয়োজন সহমর্মিতা ও সহযোগিতা-এমন মন্তব্য করেছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব সাবসটেন্স ইউজ প্রফেশনালসের (আইসাপ) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এম. এ. মোহিত কামাল।

তিনি বলেন, একজন মানুষের বর্তমান সমস্যা কখনোই তার সম্পূর্ণ পরিচয় হতে পারে না। মাদক নির্ভরশীল ব্যক্তিকে অপমান বা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন না করে চিকিৎসা, পারিবারিক সহায়তা এবং পুনর্বাসনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর শ্যামলীতে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের সভাকক্ষে ‘রিকভারি ডে ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন ও আইসাপ বাংলাদেশ চ্যাপ্টার যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

অধ্যাপক মোহিত কামাল বলেন, টেকসইভাবে মাদকমুক্ত থাকার জন্য শুধু চিকিৎসা যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে প্রয়োজন পারিবারিক সহযোগিতা, চিকিৎসা-পরবর্তী সেবা, সহায়তামূলক গোষ্ঠী, পুনরায় মাদক গ্রহণ প্রতিরোধ, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ। চিকিৎসা শেষে একজন ব্যক্তি যদি আবার বেকারত্ব, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, পুরোনো পরিবেশ ও সামাজিক কলঙ্কের মধ্যে ফিরে যান, তাহলে পুনরায় মাদক গ্রহণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

তিনি মাদক ব্যবহারকারীকে ‘নেশাখোর’সহ কোনো অপমানজনক পরিচয়ে না ডেকে মাদক নির্ভরশীল ব্যক্তিকে একজন অসুস্থ মানুষ হিসেবে দেখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “একজন মানুষের বর্তমান সমস্যাই তার সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। কলঙ্ক নয়, সহমর্মিতাই রিকভারির পথকে সহজ করে।”

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের পরিচালক এবং আইসাপ বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল মাসুদ।

তিনি বলেন, মাদকাসক্তি থেকে সেরে ওঠা মানে শুধু মাদক গ্রহণ বন্ধ করা নয়; এটি একটি চলমান পরিবর্তনের প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে একজন ব্যক্তি মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব কাটিয়ে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি, জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি, আত্মনির্ভরশীলতা এবং নিজের সম্ভাবনা বিকাশের দিকে এগিয়ে যান।

ইকবাল মাসুদ জাতীয় গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো মাদক ব্যবহার করছেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। তাদের বড় একটি অংশ অল্প বয়সেই মাদক গ্রহণ শুরু করেন। গবেষণা অনুযায়ী, ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সে এবং ৫৯ শতাংশ ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ করেন।

তিনি আরও জানান, প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী বলেছেন, তাদের কাছে মাদক সহজলভ্য। প্রায় ৬৯ শতাংশ চিকিৎসা বা পুনর্বাসন চান এবং ৬২ শতাংশ কাউন্সেলিং সেবা নিতে আগ্রহী। তবে মাত্র ১৩ শতাংশ চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের সুযোগ পেয়েছেন। চিকিৎসার চাহিদা ও সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে এই ব্যবধান মাদক চিকিৎসা ব্যবস্থার ঘাটতিকে স্পষ্ট করে।

বক্তারা বলেন, মাদক নির্ভরশীলতা থেকে সেরে ওঠা এককালীন কোনো ঘটনা নয়; এটি নিয়মিত চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, পারিবারিক সহযোগিতা ও সামাজিক সহায়তার মাধ্যমে সুস্থ থাকার একটি চলমান প্রক্রিয়া। তাই বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসার পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তারা মাদক সমস্যাকে শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে না দেখে জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসার দৃষ্টিকোণ থেকেও বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে জেলা পর্যায়ে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে মাদকাসক্তির চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং সেবা যুক্ত করা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার, প্রশিক্ষিত জনবল বৃদ্ধি এবং নারী ও কিশোর-কিশোরীদের জন্য বিশেষায়িত সেবা নিশ্চিত করার দাবি জানান।

অনুষ্ঠানে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের সিনিয়র সাইকোলজিস্ট রাখি গাঙ্গুলীর সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন দৈনিক ইত্তেফাকের সিনিয়র রিপোর্টার জামিউল আহ্সান শিপু, বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র ‘আশ্রয়’-এর পরিচালক মো. শামীম খান, সেফ হোম মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের পরিচালক লুৎফর রহমান মানিক এবং ‘উৎস’ মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক মো. শাহাবুদ্দিন চৌধুরী সুমন।

সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী ‘রিকভারি মাস’ হিসেবে পালিত হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য—‘রিকভারি ইজ রিয়েল: রিস্টোরিং এভরি অ্যাসপেক্ট অব লাইফ’, যার অর্থ ‘সেরে ওঠা বাস্তব: জীবনের প্রতিটি দিক পুনরুদ্ধার’।

বক্তারা বলেন, কলঙ্কের পরিবর্তে সহমর্মিতা, বিচারের পরিবর্তে সহায়তা এবং বর্জনের পরিবর্তে অন্তর্ভুক্তির পরিবেশ তৈরি করা গেলে মাদক নির্ভরশীল ব্যক্তিদের সুস্থ জীবনে ফিরে আসার পথ আরও সহজ হবে। যথাযথ চিকিৎসা ও সামাজিক সহযোগিতা পেলে মাদক থেকে সেরে উঠে একজন মানুষ নতুনভাবে স্বাভাবিক জীবন শুরু করতে পারেন।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা