শাকিলা সুলতানা : দেশে ছড়িয়ে পড়া আন্তর্জাতিক অনলাইন জুয়া ও অবৈধ অর্থপাচার চক্রের অন্যতম মূল এজেন্ট স্নিগ্ধ সিকদারকে (৩১) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর এলাকা থেকে পরিচালিত এক বিশেষ অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, গ্রেপ্তারকৃত স্নিগ্ধ সিকদার একাধিক অবৈধ অনলাইন জুয়া ও বেটিং সাইটের মূল পরিচালনাকারী ও এজেন্ট হিসেবে সক্রিয় ছিলেন।
সংগৃহীত অর্থের কমিশন রেখে বাকি টাকা ব্যাংক হিসাব ও ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিদেশে পাচার করাই ছিল এই চক্রের মূল কাজ।
যেভাবে গ্রেপ্তার হলেন স্নিগ্ধ সিকদার
সিআইডির সাইবার মনিটরিং টিমের নিয়মিত নজরদারিতে ধরা পড়ে দেশে ও বিদেশ থেকে পরিচালিত একাধিক বেটিং সাইটের কার্যক্রম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব সাইটের আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে সাধারণ মানুষকে জুয়ায় প্রলুব্ধ করা হতো। পরবর্তীতে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ভোরে সিআইডির একটি দল বেনাপোল সীমান্ত এলাকা থেকে নড়াইল সদরের বালিয়াট গ্রামের স্নিগ্ধ সিকদারকে গ্রেপ্তার করে।
এর আগে গত ১৩ জুলাই এই মামলার অপর আসামি এবং চক্রের অন্যতম বাংলাদেশ কো-অর্ডিনেটর সুমন রায়কে গ্রেপ্তার করা হয়। সুমন রায় আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে স্নিগ্ধ সিকদারের নাম ও তার অপরাধের খতিয়ান প্রকাশ করেন।
দোষ স্বীকার ও আদালতে জবানবন্দি
গ্রেপ্তারের পর স্নিগ্ধ সিকদারকে সিআইডি তেজগাঁও থানার মামলায় (মামলা নং-২০, তারিখ: ১৭/০৫/২০২৬ খ্রি., ধারা: সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬) তদন্তপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখায়। গত ৩০ সেপ্টেম্বর তাকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি ১৬৪ ধারায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি প্রদান করেন।
তদন্তে যা উন্মোচিত হলো
সিআইডির তদন্তে জানা যায়, এই চক্রটি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এজেন্ট নিয়োগ করত। এজেন্টরা সাধারণ ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিশাল অংকের টাকা সংগ্রহ করত। এরপর নিজেদের নির্দিষ্ট কমিশন কেটে রেখে বাকি অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে নিমেষেই বিদেশে পাচার করে দিত।
ইতিপূর্বেও ধরা পড়েছে বড় বড় সদস্য এই চক্রটির মূলোৎপাটনে সিআইডি ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে আসছে:
জুন ২০২৬: টাঙ্গাইল থেকে মো. সোলায়মান, মো. সাগর মিয়া ও মো. জুয়েল রানা গ্রেপ্তার।
১৬ জুন ২০২৬: নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ থেকে মো. রায়হান খান, মো. পাভেল রহমান ভূঁইয়া ও আবু জোবায়ের সানি গ্রেপ্তার।
১২ জুলাই ২০২৬: নড়াইল থেকে মো. জসিম উদ্দিন ও সুমন রায় গ্রেপ্তার।
১৯ আগস্ট ২০২৬: রাজশাহী পদ্মার আবাসিক এলাকা থেকে সৈয়দ জামান ও রুহুল কুদ্দুস ওরফে বাপ্পী গ্রেপ্তার।
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬: টাঙ্গাইল থেকে বাবলু মিয়া, মো. মনির হোসেন, নূর সাফায়েত ইপ্তি ও শামীম আল মামুন গ্রেপ্তার।
সিআইডির কড়া বার্তা ও হুঁশিয়ারি
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ জানান, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে দেশের অর্থ বিদেশে পাচারকারী দেশি-বিদেশি পুরো চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় না আনা পর্যন্ত এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।
একই সাথে সাধারণ জনগণকে অনলাইন জুয়া ও বেটিংয়ের প্রলোভনে পা না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সিআইডি। এ ধরনের অবৈধ লেনদেনের খবর জানতে পারলে নিকটস্থ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করার অনুরোধ করা হয়েছে
