সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর ইউনিয়নের বন্যতলা এলাকায় খোলপেটুয়া নদীর ভয়াবহ ভাঙনে প্রায় ৩০০ ফুট বেড়িবাঁধ ধসে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ঝোড়ো হাওয়া ও উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বিভাগ-২-এর আওতাধীন ৭/১ পোল্ডারের বাঁধে এ ভাঙন দেখা দেয়। এতে বন্যতলা গ্রামসহ পার্শ্ববর্তী প্রতাপনগর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আতঙ্কে রয়েছেন উপকূলের বাসিন্দারা।
ভাঙনের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় মসজিদের মাইকে এলাকাবাসীকে সতর্ক করা হয়। বসতভিটা ও জনপদ রক্ষায় রাতেই বাঁধের কাছে ছুটে আসেন বন্যতলা ও পার্শ্ববর্তী প্রতাপনগর ইউনিয়নের সহস্রাধিক মানুষ। তাঁরা স্বেচ্ছাশ্রমে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা শুরু করেন। বৃহস্পতিবা ও ভাঙন প্রতিরোধে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ অব্যাহত ছিল।
পদ্মপুকুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমজাদুল ইসলাম জানান, সন্ধ্যায় ঝোড়ো হাওয়া ও খোলপেটুয়া নদীর প্রবল ঢেউয়ের আঘাতে বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে ভাঙন দেখা দেয়। এতে প্রায় ৩০০ ফুট বাঁধ ধসে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। কোনো কোনো স্থানে বাঁধের মাত্র এক থেকে দেড় ফুট অংশ অবশিষ্ট রয়েছে। পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় স্থানীয়দের সতর্ক করা হয়। পরে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় আগে থেকে প্রস্তুত রাখা বালুভর্তি জিও ব্যাগ দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ শুরু হয়। ভাঙনস্থলের কিছু অংশে ইতিমধ্যে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। শুক্রবারের মধ্যে বাকি অংশেও জিও ব্যাগ ফেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী আবু দাউদ ঢালি বলেন, ভাঙনস্থলটি পদ্মপুকুর ইউনিয়নের বন্যতলা এলাকায় হলেও এর পাশেই প্রতাপনগর ইউনিয়ন। ওই স্থান দিয়ে নদীর পানি লোকালয়ে ঢুকলে প্রতাপনগরের বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে খবর পেয়েই তিনি লোকজন নিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। রাতেই জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু হয়। পাউবো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁর লোকজন ভাঙন প্রতিরোধে কাজ করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ৭/১ পোল্ডারের বন্যতলা এলাকায় খোলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধ দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ। বাঁধ সংস্কারের জন্য আগেই খুলনার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স বাবুল এন্টারপ্রাইজকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবহারের জন্য বালুভর্তি হাজার হাজার জিও ব্যাগও প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। তবে সেগুলো সময়মতো ঝুঁকিপূর্ণ অংশে ফেলা হয়নি। আগে থেকেই জিও ব্যাগ ফেলা হলে এমন পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হতো বলে মনে করছেন তাঁরা।
স্থানীয় ঘেরমালিক রবিউল ইসলাম বলেন, বাঁধ সংস্কারের জন্য বিপুলসংখ্যক জিও ব্যাগ প্রস্তুত রাখা হলেও সেগুলো সময়মতো ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে ব্যবহার করা হয়নি। ফলে নদীর প্রবল স্রোতে বাঁধ ধসে পড়েছে। দ্রুত ভাঙন ঠেকানো না গেলে বন্যতলা গ্রামসহ প্রতাপনগরের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হতে পারে। এতে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও মৎস্যঘেরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। আগেভাগে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে পরিস্থিতি এতটা নাজুক হতো না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ভাঙন পরিস্থিতি সম্পর্কে আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শ্যামানন্দ কুন্ডু বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক ও শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকেও অবহিত করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা স্বেচ্ছাশ্রমে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা করছেন।
সাতক্ষীরা পাউবো বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুর রহমান তাযকিয়া বলেন, ভাঙনের খবর পাওয়ার পর রাতেই সেখানে লোক পাঠানো হয়। আগে থেকে প্রস্তুত রাখা বালুভর্তি জিও ব্যাগ স্থানীয়দের সহযোগিতায় ভাঙনস্থলে ফেলা হচ্ছে। শুক্রবারের মধ্যে এ কাজ শেষ করা গেলে ভাঙন প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জিও ব্যাগ ফেলতে দেরির বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, বন্যতলার ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ মেরামতের জন্য আগেই ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছিল। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিও ব্যাগে বালু ভরে সেগুলো প্রস্তুতও রেখেছিল। তবে টাস্কফোর্সের মাধ্যমে ব্যাগ গণনা ও চিহ্নিত করার পর সেগুলো ভাঙনস্থলে ফেলার নিয়ম রয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গিয়ে জিও ব্যাগ ফেলতে কিছুটা দেরি হয়েছে।
এদিকে খোলপেটুয়া নদীর ভাঙন ঠেকাতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের আশঙ্কা, সময়মতো বাঁধ রক্ষা করা না গেলে নদীর পানি লোকালয়ে ঢুকে বিস্তীর্ণ জনপদ প্লাবিত হতে পারে। এতে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও মৎস্যঘেরের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবিকাও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
