ফাহাদ-ই-আজম, সাভার প্রতিনিধি : তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, ব্ল্যাকলিস্টিং প্রথা বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে সাভার, হেমায়েতপুর ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিল্পাঞ্চলের ১৭৭টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। এদিকে কয়েকটি স্থানে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করলে গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
সোমবার (২ নভেম্বর) সকাল থেকে সাভার ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ শুরু হয়। শ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কারখানার সামনে এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
সাভারের হেমায়েতপুরে মহাসড়ক অবরোধ সাভারের হেমায়েতপুর এলাকায় মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এ সময় হেমায়েতপুর-সিংগাইর সড়কের দুই পাশে অবস্থিত কয়েকটি কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও জানালার কাচ ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে একেএইচ গ্রুপের কারখানা লক্ষ্য করেও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা।
হেমায়েতপুর এলাকার কমফোর্ট কালেকশন কারখানার অপারেটর ফয়সাল আহমেদ বলেন, অন্যান্য কারখানায় শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা হলেও তাঁদের কারখানায় দেওয়া হয় সাড়ে আট হাজার টাকা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে এই মজুরিতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণেই শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন।
আশুলিয়ায় ১৭৭ কারখানায় সাধারণ ছুটি
অন্যদিকে আশুলিয়ার পল্লীবিদ্যুৎ, ইউনিক, জামগড়া, নরসিংহপুর, জিরাবো ও কাঠগড়া শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। সকাল থেকেই আল-মুসলিম, সাবিহা অ্যাপারেলস, টাউজার লাইন, নিট এশিয়াসহ বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নরসিংহপুর ও আশপাশের এলাকার আরও কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে আসেন।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নিট এশিয়া কারখানা বন্ধ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে শারমিন গ্রুপের সামনে শ্রমিকদের জটলা তৈরি হয়। পরে বেলা সাড়ে ১১টার পর ইউনিক ও নরসিংহপুর এলাকায় শ্রমিকরা আবদুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কে অবস্থান নেন। এতে ওই মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় দুই ঘণ্টা অবরোধের পর পুলিশের হস্তক্ষেপে শ্রমিকরা সড়ক ছেড়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
এ ছাড়া অনন্ত গার্মেন্টসের কিছু শ্রমিক ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে সড়কে নামার চেষ্টা করেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বলে। কারখানা কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই ছুটি ঘোষণা করায় শ্রমিকদের বুঝিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে নিজ নিজ গন্তব্যে ফেরত পাঠানো হয়।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে সকালে কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা কর্মস্থলে যোগ দিয়ে কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে নরসিংহপুর, জিরাবো ও কাঠগড়াসহ আশপাশের এলাকার বেশ কয়েকটি কারখানা কর্তৃপক্ষ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে।
আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের বাড়ইপাড়া থেকে ডিইপিজেড এলাকার বাইরের কারখানাসহ বাইপাইল, ইউনিক, জামগড়া, নরসিংহপুর, কাঠগড়া ও জিরাবো এলাকার মোট ১৭৭টি পোশাক কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্প পুলিশের সতর্ক অবস্থান
শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমিত করতে সকাল থেকেই শিল্প পুলিশ বিভিন্ন এলাকায় গাড়িতে মাইকিং করে। মাইকিংয়ে শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবি ও অধিকার আদায়ের বিষয়ে পুলিশের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়। একই সঙ্গে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
শিল্প পুলিশ-১-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপারেশনস অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স) শোয়েব আহম্মেদ বলেন, সকাল ৬টা থেকেই পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন ছিলেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নিট এশিয়া কারখানা বন্ধ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে কিছু শ্রমিক শারমিন গ্রুপের সামনে জড়ো হলেও তাঁরা শান্তিপূর্ণ ছিলেন। পুলিশ দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখে।
তিনি আরও জানান, পরবর্তীতে অনন্ত গার্মেন্টসের কিছু শ্রমিক ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে সড়কে নামার চেষ্টা করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বলে। কারখানা কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করায় শ্রমিকদের বুঝিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করা হয়।
এদিকে শ্রমিকদের কর্মবিরতি ও বিক্ষোভের মধ্যেও শিল্পাঞ্চলের অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম চালু ছিল। বন্ধ কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর আগে শনিবার শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনার পর ২৫টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল।
বর্তমানে শিল্পাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
