জনতা ডেস্ক : পোল্যান্ডের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ক্রাকোর দর্শনীয় নগরকেন্দ্রে শনিবার এক বন্দুকধারীর এলোপাতাড়ি গুলিতে ছয়জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৫ জন।
এ হামলাকে কয়েক দশকের মধ্যে পোল্যান্ডের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্দুক হামলা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক জানিয়েছেন, সন্দেহভাজন হামলাকারীর বাড়ি থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজন নারী ও একজন পুরুষ। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, নিহত ব্যক্তিরা হামলাকারীর পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্য।
এ ঘটনায় দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালনের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী টাস্ক। তিনি এই হামলাকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
পোল্যান্ডের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মারচিন কিয়ারভিনস্কি বলেছেন, হামলাকারী উগ্র কট্টর ডানপন্থী মতাদর্শের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুলিশপ্রধান মারেক বোরোন জানিয়েছেন, নিহতদের মধ্যে এক ব্রিটিশ নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের মধ্যে পাঁচজন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
নিহতদের পরিচয় সম্পর্কে পুলিশপ্রধান বলেন, ‘এখনো দুজনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।’
এদিকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম এ ঘটনায় গভীর শোক ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘এই ভয়াবহ বন্দুক হামলায় আমি গভীরভাবে মর্মাহত ও শোকাহত। যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের পরিবারের সদস্যদের, আহত ব্যক্তিদের এবং এই নির্বিচার সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত সবাইকে আমার সমবেদনা জানাচ্ছি।’
পুলিশ জানিয়েছে, ২০০২ সালে জন্ম নেওয়া পোলিশ নাগরিক ওই হামলাকারী গাড়ি চালিয়ে ক্রাকোর প্রধান বাজার চত্বরে প্রবেশ করেন। এরপর সেখানে উপস্থিত সাধারণ মানুষের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করেন।
তাকে থামানোর চেষ্টা করতে গিয়ে পুলিশের দুই সদস্য আহত হন। পরে পুলিশ তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। একপর্যায়ে তাঁকে আটক করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ঘটনাস্থলে থাকা এএফপির এক প্রতিবেদক জানান, হামলার পর ওই এলাকায় অ্যাম্বুলেন্স ও পুলিশের একাধিক গাড়ি দেখা যায়। নিরাপত্তাকর্মীরা পুরো এলাকা ঘিরে ফেলেন। ক্রাকোর এই ঐতিহাসিক চত্বরটি পোল্যান্ডের অন্যতম বিখ্যাত পর্যটনকেন্দ্র। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক এখানে ভিড় করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিয়ারভিনস্কি বলেন, ‘সবকিছু বিবেচনায় মনে হচ্ছে, হামলাকারীর চিন্তাভাবনা ছিল অত্যন্ত উগ্র। তিনি যে গাড়িটি চালিয়ে এসেছিলেন, সেটি থেকে বেশ কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সবকিছুই ইঙ্গিত করছে, তিনি কট্টর ডানপন্থী মতাদর্শে প্রভাবিত ছিলেন এবং তার মধ্যে চরম জাতীয়তাবাদী চিন্তাভাবনা কাজ করত।’
হামলার সময় ওই ব্যক্তি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মতো পোশাক পরেছিলেন বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য পুলিশের প্রশংসা টাস্কের
পুলিশপ্রধানের মুখপাত্র আন্দ্রেজ ফিয়োলেক জানিয়েছেন, হামলাকারী যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এআর-১৫ রাইফেলের মতো একটি সেমি-অটোমেটিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছিলেন।
১৯৮৯ সালে কমিউনিস্ট শাসনের অবসানের পর পোল্যান্ডে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী বন্দুক হামলা। তবে হামলায় নিহত সব ব্যক্তির জাতীয়তা এখনো প্রকাশ করেনি কর্তৃপক্ষ।
প্রধানমন্ত্রী টাস্ক বলেন, ‘দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নেওয়া বীর পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রতি আমাদের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও প্রশংসা।’
শনিবার সন্ধ্যায় এএফপির প্রতিবেদকেরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন, সাধারণত মানুষের ভিড়ে মুখর থাকা প্রধান বাজার চত্বরটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত পুলিশ সদস্য ও অপরাধ তদন্ত বিভাগের বিশেষজ্ঞরা হামলার আলামত পরীক্ষা করছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা এএফপিকে জানান, হামলার সময় অনেকে আশপাশের দোকান ও রেস্তোরাঁয় আশ্রয় নেন।
ষাট বছর বয়সী অ্যানেট নামের এক নারী বলেন, ‘আমি এক ব্যক্তিকে চত্বরে ঘুরে ঘুরে মানুষের ওপর গুলি চালাতে দেখেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ক্রাকোর জন্য এটি এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। এর আগে আমরা কখনো এমন ঘটনা দেখিনি।’
৩২ বছর বয়সী সংগীতশিল্পী ড্যানিয়েল ভলনি বলেন, ‘আমি একজনকে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি। তার কিছুটা দূরে আরও কয়েকজন পড়ে ছিলেন। তখনো তাদের বাঁচানোর চেষ্টা চলছিল। কয়েকজন নিজেদের পোশাক খুলে সেই কাপড় দিয়ে আহতদের রক্তপাত বন্ধ করার চেষ্টা করছিলেন।’
ফ্রান্সের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর রেন থেকে আসা ২২ বছর বয়সী পর্যটক স্টেলা বলেন, ‘ইউরোপে এখনো সন্ত্রাসী হামলার মতো ঝুঁকি রয়েছে—এ কথা ভাবতেই ভয় লাগে।’
চত্বরের কাছের একটি বারে কর্মরত ৩৩ বছর বয়সী গ্যাব্রিয়েল বোগদান বলেন, ‘ক্রাকো সব সময়ই অত্যন্ত নিরাপদ শহর হিসেবে পরিচিত। আমাদের জীবদ্দশায় এ ধরনের ঘটনা সম্ভবত এই প্রথম দেখলাম।’
