মো. কেফাইতুল ভুঁইয়া, বিজয়নগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার হরষপুর ইউনিয়নের নিদারাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সৌরভী খানমের সংযুক্তিতে ঢাকায় অবস্থান এবং মূল কর্মস্থলের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর দেওয়ার ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই শিক্ষক একই সময়ে দুই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকায় বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, সৌরভী খানম ২০২০ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। চাকরিতে যোগদানের পর তিনি বিজয়নগর উপজেলার হাজীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪ বছর ১১ মাস ১২ দিন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে অনলাইন বদলি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একই উপজেলার নিদারাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হয়ে গত বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি যোগদান করেন।
তবে বদলির প্রায় সাত মাসের মধ্যেই তিনি ঢাকার গুলশান সিটি করপোরেশন এলাকার কালাচাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক বছরের জন্য সংযুক্তিতে যান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। প্রায় এক বছর সংযুক্তিতে থাকার পর চলতি বছরের ২৫ মার্চ পুনরায় অধিদপ্তর থেকে তার সংযুক্তির আদেশ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে, নিদারাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট থাকলেও সৌরভী খানম দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় সংযুক্তিতে থাকায় বিদ্যালয়ের নিয়মিত পাঠদান ও শ্রেণি কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এর মধ্যে বিদ্যালয়ের আরও একজন সহকারী শিক্ষক মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকায় শিক্ষক সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
মূল স্কুলে হাজিরা নিয়ে প্রশ্ন
সৌরভী খানমের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, গত ২৭ জুলাই ঢাকার সংযুক্তি বিদ্যালয়ে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তিনি নিদারাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যান এবং কোনো ধরনের যোগদানপত্র না দিয়েই বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতায় উপস্থিতির স্বাক্ষর করেন।
অভিযোগ রয়েছে, ওই দিন বিকেল ৩টার দিকে বিদ্যালয়ে গিয়ে হাজিরা খাতায় দেওয়া তার স্বাক্ষর ফ্লুইড দিয়ে মুছে ফেলেন তিনি। বিষয়টি জানাজানি হলে বিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
বিজয়নগর উপজেলা শিক্ষা অফিসার স্বর্ণজিৎ দেব বলেন, “একজন সহকারী শিক্ষক সংযুক্তিতে থাকার পর মূল স্কুলে যোগদান না করে হঠাৎ এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর দেওয়া এবং পরে তা মুছে ফেলা মারাত্মক অন্যায়। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।”
সংযুক্তি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য
ঢাকার গুলশান-কালাচাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদৌস মুঠোফোনে বলেন, “সৌরভী খানম সংযুক্তিতে আমাদের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তিনি ২৬ ও ২৭ জুলাই দুই দিন ছুটিতে ছিলেন। তবে কেন তিনি ২৭ জুলাই তার মূল স্কুলে গিয়ে হাজিরা খাতায় উপস্থিতির স্বাক্ষর করেছেন, সেটা আমি সঠিক বলতে পারছি না।”
এ বিষয়ে সংযুক্তি বিদ্যালয়ের আওতাভুক্ত শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
গুলশান থানা শিক্ষা অফিসার মাহরুক জাবীন বলেন, “একজন সহকারী শিক্ষক সংযুক্তি বিদ্যালয়ে থাকার পর মূল বিদ্যালয়ে গিয়ে দৈনিক হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করা অন্যায়। একজন শিক্ষক একই দিনে কীভাবে দুই প্রতিষ্ঠানে উপস্থিতি দেন, তা বুঝতে পারছি না। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে দেখা হবে।”
শিক্ষক সংকটে ব্যাহত পাঠদান
নিদারাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবু হানিফ বলেন, “সৌরভী খানম এর আগেও এক বছর ঢাকার গুলশানের একটি বিদ্যালয়ে সংযুক্তিতে ছিলেন। তিনি আবারও এক বছরের জন্য সংযুক্তির আদেশ করেছেন বলে জানতে পেরেছি।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ঢাকায় সংযুক্তিতে থাকায় তার মূল কর্মস্থলের শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার পাশাপাশি অভিভাবকদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
তাদের দাবি, বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
সংযুক্তির নীতিমালায় যা বলা আছে
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংযুক্তি সংক্রান্ত নীতিমালায় বলা হয়েছে, মৌলিক প্রশিক্ষণে এক বা একাধিক শিক্ষক যোগদান, কোনো শিক্ষকের সাময়িক বরখাস্তজনিত শূন্য পদ, মাতৃত্বকালীন ছুটি কিংবা অন্য কোনো উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে শিক্ষক স্বল্পতার ফলে কোনো বিদ্যালয়ে পাঠদান বিঘ্নিত হলে নির্দিষ্ট শর্তে সংযুক্তির আদেশ দেওয়া যেতে পারে।
নীতিমালা অনুযায়ী, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের প্রস্তাবের ভিত্তিতে মহাপরিচালক, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে অবহিত রেখে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সুনির্দিষ্ট মেয়াদ উল্লেখ করে সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য একই উপজেলার অভ্যন্তরে সংযুক্তির আদেশ দিতে পারেন। মেয়াদ শেষে সংযুক্তির আদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার কথা রয়েছে। একই শিক্ষককে একাধিকবার সংযুক্তি দেওয়ার সুযোগও নেই বলে নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে।
তবে সৌরভী খানমের ক্ষেত্রে পুনরায় সংযুক্তির আদেশ কীভাবে দেওয়া হয়েছে এবং তা সংশ্লিষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী হয়েছে কি না—এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এদিকে, মূল বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর দেওয়া ও পরে তা মুছে ফেলার অভিযোগের প্রায় এক মাস অতিবাহিত হলেও তার বিরুদ্ধে এখনো কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে সহকারী শিক্ষক সৌরভী খানমের বক্তব্য জানতে চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।
