রবিবার | সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশখুলনা মোংলায় নিখোঁজ মিরাজকে নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা নাটকীয়তা

মোংলায় নিখোঁজ মিরাজকে নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা নাটকীয়তা

খুলনা থেকে বি এম রাকিব হাসান : বাগেরহাটের মোংলায় নিখোঁজ মিরাজ নিয়ে চলছে জল্পনা কল্পনা নাটকীয়তা অনুসন্ধান পাল্টা অনুসন্ধন বক্তব্য পাল্টা বক্তব্য। ৫ আগষ্টের পর দেশে প্রথম গুম হওয়ার ঘটনা এটি। যা বলছেন হিউম্যান রাইটস। আর কোষ্টগার্ড বলছেন ঘটনার সাথে তাদের কোন সম্পৃক্ততা নেই। ফলে দেশজুড়ে আলোচিত এই গুমের ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে সরকার।

এদিকে মোংলা উপজেলার জয়মনি এলাকার মিরাজ শেখ গত ১০ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ রয়েছেন এবং তাঁর পরিবার চরম উদ্বেগ ও বিচার পাওয়ার দাবিতে দিন কাটাচ্ছে। এই ঘটনায় তাঁর পরিবারের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত বিপর্যস্ত, আতঙ্কগ্রস্ত এবং আইনি ও সামাজিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তাঁর স্ত্রী মুক্তা খাতুন, বাবা মোস্তফা শেখ এবং বোন লিজা ইসলাম চরম মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

তার স্ত্রী মুক্তা খাতুন অভিযোগ করে বলেন, ‘আমি নিজে দেখছি, কোস্টগার্ড আমার স্বামীকে নিয়া গ্যাছে। এহন তারা অস্বীকার করে’। তিনি কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে তাঁর স্বামীকে গুম করার অভিযোগ করেছেন। পরিবারের ভাষ্য, মিরাজ গত ১০ এপ্রিল বেলা ১১টার দিকে মাছ ধরে বাড়িতে এসে ঘুমান। সন্ধ্যার আগে অচেনা নম্বর থেকে কয়েকবার ফোন এলে তিনি বাড়ি থেকে বের হন। সন্ধ্যা সাতটার দিকে জয়মনির ঠোটা এলাকার একটি চায়ের দোকানের সামনে থেকে তাঁকে সাদাপোশাকে থাকা দুজন ধরে নিয়ে যান। খবর পেয়ে তাঁর স্ত্রী মুক্তা ছুটে গিয়ে দেখেন, কোস্টগার্ডের স্পিডবোটে তুলে মিরাজকে মোংলার দিকে নেওয়া হচ্ছে।

বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার বাসিন্দা মিরাজ শেখ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটিকে ৫ আগস্ট পরবর্তী দেশের প্রথম গুমের ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে মানবাধিকার কর্মীরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। চলতি বছরের ১০ এপ্রিল মোংলার জয়মনির ঘোল এলাকা থেকে কোস্টগার্ডের পোশাক ও সাদা পোশাকে কয়েকজন ব্যক্তি তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায় বলে তার পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেছেন।

সম্প্রতি বাগেরহাট সফরে এসে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, সারা বাংলাদেশের মধ্যে মিরাজ শেখের ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কেস স্টাডি। এই গুমের অভিযোগটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এবং গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং তার পরিবার যেন ন্যায়বিচার পায় তা নিশ্চিত করা হবে।

সূত্রমতে, গত ১২ জুন মিরাজ শেখের বাবা একটি রিট আবেদন করার পর, ১২ জুলাই হাইকোর্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে নিখোঁজ মিরাজকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। মিরাজের নিখোঁজ হওয়ার পর প্রতিবাদ করতে গিয়ে তার পরিবারের সদস্যরা সরকারি স্থাপনা ভাঙচুরের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পরবর্তীতে আইন মন্ত্রণালয়ের লিগ্যাল এইড ইউনিটের সহায়তায় তাদের জামিন করানো হয়। মানবাধিকার সংগঠন ও অন্যান্যদের অবস্থানআসক ও এইচআরএসএস-এর দাবি: আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (ঐজঝঝ) এই ঘটনার একটি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে। মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন অভিযোগ করেছেন যে, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর কথা না বলার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। জাতীয় সংসদে উত্থাপিত গুম প্রতিরোধ বিলের প্রসঙ্গে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ মোংলার মিরাজ শেখসহ গুমের শিকার সবাইকে খুঁজে বের করার দাবি জানিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

অপরদিকে, বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়েছে। তাদের দাবি, মিরাজ শেখকে কখনোই আটক বা হেফাজতে নেওয়া হয়নি এবং স্থানীয়ভাবে তার বিরুদ্ধে সুন্দরবনের জলদস্যুদের লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া ও মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মন্তব্য করেছেন যে, পন্টুন অপসারণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ক্ষোভের কারণে বিষয়টিকে গুমের রূপ দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে এবং এটি জলদস্যুদের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের ফলেও ঘটতে পারে। বর্তমানে মোংলা থানা পুলিশ ঘটনাটি নিয়ে একটি সাধারণ ডায়েরির (জিডি) ভিত্তিতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।

মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুন, বোন লিজা ইসলাম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো (যেমন- এইচআরএসএস ও ব্লাস্ট) মিরাজকে জীবিত উদ্ধারের দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছে। পরিবার ও স্থানীয়রা মিরাজের সন্ধান চাইতে গেলে কোস্টগার্ডের সঙ্গে সংঘষের ঘটনায় মিরাজের মা, বোন ও স্ত্রীসহ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়। এছাড়া সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।

মিরাজ (৩০) সুন্দরবনে মাছ ধরার পাশাপাশি ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালাতেন। রিট আবেদনকারীর আইনজীবী মুহা. মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, মিরাজকে বেআইনিভাবে আটক রাখা হয়নি, এ বিষয়ে আদালত যাতে সন্তুষ্ট হতে পারেন, সে জন্য তাঁকে হাজির করতে এবং তাঁর অবস্থান প্রকাশ করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রসচিব, কোস্টগার্ডের মহাপরিচালক, পুলিশের মহাপরিদর্শক, র‌্যাবের মহাপরিচালক, বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ ৯ বিবাদীকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে বলে জানান রিট আবেদনকারীর এই আইনজীবী।

বি এম রাকিব হাসান,
খুলনা:

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা