শ্রীমঙ্গল থেকে শাহাব উদ্দিন আহমদ : ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, মশকনিধন কার্যক্রম জোরদার এবং ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে আয়োজিত এক আলোচনা সভার বক্তারা। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সভাকক্ষে বসুন্ধরা শুভসংঘের উদ্যোগে এ সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জেলার ডেঙ্গু পরিস্থিতির পাশাপাশি হামের সংক্রমণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট কলামিস্ট, আরপি নিউজের সম্পাদক ও ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট’-এর বিশেষ প্রতিনিধি কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান। ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু এখন শুধু স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্য ও নাগরিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই এর বিস্তার রোধে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা এবং কার্যকর মশকনিধন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় প্রশাসন, পৌরসভা, স্বাস্থ্য বিভাগ ও সামাজিক সংগঠনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা নেওয়ার চেয়ে রোগ প্রতিরোধের ওপর আমাদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।’
সভায় জানানো হয়, মৌলভীবাজার জেলায় এ পর্যন্ত ৭৭৬ জনের ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হয়েছে, যাঁদের মধ্যে ৩৭ জনের শরীরে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে ৩২ জন, শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩ জন, কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১ জন এবং বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। বর্তমানে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে দুজন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালেও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে শ্রীমঙ্গল পৌরসভা পরিচালিত মশকনিধন ও স্প্রে কার্যক্রম আরও কার্যকর ও নিয়মিত করার ওপর জোর দেন বক্তারা।
ডেঙ্গুর পাশাপাশি জেলায় হামের সংক্রমণের চিত্রও সভায় তুলে ধরা হয়। বক্তারা জানান, জেলায় এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৮৮৪ জন রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে বর্তমানে প্রায় ৫০ জন হাম রোগী ভর্তি রয়েছেন, যাঁদের মধ্যে ৩০ জন শিশু ও ২০ জন প্রাপ্তবয়স্ক। চিকিৎসাধীন অবস্থায় জেলায় অন্তত ১৫ শিশুর মৃত্যুর তথ্যও সভায় জানানো হয়। ডেঙ্গুর পাশাপাশি অন্যান্য সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করার তাগিদ দেন বক্তারা।
বক্তারা বলেন, এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার ও জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে। তাই শুধু মশকনিধন ও ওষুধ ছিটানোর ওপর নির্ভর না করে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে ব্যক্তি ও সামাজিক উদ্যোগ বাড়াতে হবে। বাড়িঘর, বিদ্যালয়, দোকানপাট ও আশপাশের পরিবেশ নিয়মিত পরিষ্কার রাখার আহ্বান জানিয়ে তাঁরা বলেন, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের পাত্র, ছাদ ও ড্রেনসহ যেসব স্থানে পানি জমে থাকতে পারে, সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। একই সঙ্গে মশার কামড় থেকে বাঁচতে মশারি ব্যবহার, প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন এবং ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার পরামর্শ দেন তাঁরা।
জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, শরীর ও পেশিতে ব্যথা, দুর্বলতাসহ ডেঙ্গুর সম্ভাব্য উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানান বক্তারা। নিজের পাশাপাশি পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদেরও এ বিষয়ে সচেতন করার অনুরোধ জানান তাঁরা।
সভা থেকে বলা হয়, ডেঙ্গু প্রতিরোধ কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। পৌরসভা, প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগেই এডিস মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতা বাড়িয়ে শ্রীমঙ্গলকে ডেঙ্গুর ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।
দৈনিক কালের কণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি ও বসুন্ধরা শুভসংঘের উপদেষ্টা মো. সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন শ্রীমঙ্গল বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির উপদেষ্টা ও ব্যবসায়ী মো. হাফিজ আহমেদ, শ্রীমঙ্গল ব্যবসায়ী সমিতির যুগ্ম সম্পাদক মো. আখতার হোসেন, প্রবীণ সাংবাদিক ইসমাইল মাহমুদ, শ্রীমঙ্গল প্রেস ক্লাবের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক এম এ রকিব এবং শ্রীমঙ্গল আইডিয়াল স্কুলের প্রিন্সিপাল এহসান বিন মুজাহির। এ ছাড়া বক্তব্য দেন বসুন্ধরা শুভসংঘের শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ওমর ফারুক, কোষাধ্যক্ষ জুলহাকাম, সদস্য তপন বৈদ্য ও মো. ফজলে রাব্বি। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কাজল হাজরা, আফজাল মিয়া, আরিফ আহমেদ ও শরীফ আহমেদসহ সংগঠনের অন্য সদস্যরা।
