রবিবার | অক্টোবর ১৮, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ কক্সবাজারের হোটেল থেকে কুমিল্লার ধানক্ষেতে, স্কুলছাত্রী তাজমিন হত্যা রহস্যের জট খুলল

কক্সবাজারের হোটেল থেকে কুমিল্লার ধানক্ষেতে, স্কুলছাত্রী তাজমিন হত্যা রহস্যের জট খুলল

কক্সবাজার থেকে রিয়াজ উদ্দিন : কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে অবস্থানের পর কুমিল্লার ধানক্ষেতে স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনের (১৫) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়াকে (৩৫) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, কুমিল্লায় যাওয়ার পথে তাজমিনকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে তার মরদেহ ধানক্ষেতে ফেলে রেখে পালিয়ে যান অভিযুক্ত চালক।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ অক্টোবর সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার ভড়ালজোড়পুর উত্তরপাড়া গ্রামের একটি ধানক্ষেতের আইলের পাশে কিশোরীর মরদেহ পড়ে থাকার খবর পেয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করা হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরিবারের সদস্যরা মরদেহটি জান্নাতুল তাজমিনের বলে শনাক্ত করেন। তিনি কুমিল্লা নগরীর করিমা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন।

এ ঘটনায় লালমাই থানায় হত্যা মামলা হওয়ার পর জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ও থানা পুলিশ যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে সিএনজিচালক সুমন মিয়াকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন এবং ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা যায়, ঘটনার দিন রাতে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডের তিশা বাস কাউন্টারের সামনে থেকে বাসায় যাওয়ার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করেন তাজমিন। চালক সুমন ৫০০ টাকা ভাড়া চাইলে শেষ পর্যন্ত ৩০০ টাকায় যাওয়ার বিষয়ে সমঝোতা হয়। পথে একটি দোকান থেকে চালকের জন্য রুটি ও কলা কেনেন তিনি।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তাজমিনকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে সুমন অটোরিকশাটি নির্জন সড়কের দিকে নিয়ে যান। একপর্যায়ে অটোরিকশা থামিয়ে দিলে তাজমিন কারণ জানতে চান। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তিনি অটোরিকশা থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করেন। তখন চালক তাঁকে আটকে রেখে গামছা দিয়ে গলা পেঁচিয়ে ধরেন। পরে তাঁকে ধর্ষণ করে ধানক্ষেতে নিয়ে হত্যা করেন বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে।

হত্যার পর তাজমিনের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটি আইফোন নিয়ে ব্যাগটি ধানক্ষেতে ফেলে রাখা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরে অভিযুক্ত চালক অটোরিকশাটি রেখে অন্য একটি অটোরিকশায় করে বাবারবাজার এলাকায় যান। সেখানে একটি জঙ্গলে ফোনটি লুকিয়ে রেখে চট্টগ্রামে পালিয়ে যান বলে তদন্তে জানা গেছে।

পুলিশ আরও জানায়, সুমনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাবারবাজার এলাকার একটি জঙ্গল থেকে তাজমিনের আইফোন উদ্ধার করা হয়েছে। ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার করা হয়েছে তাঁর ভ্যানিটি ব্যাগও। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার রাতে তাজমিন তাঁর বাবার সঙ্গে নিজের অবস্থানের তথ্য শেয়ার করেছিলেন। তবে তাঁর বাবা তাৎক্ষণিকভাবে সেটি দেখতে পারেননি।

এদিকে কক্সবাজারে তাজমিনের অবস্থানের বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পেয়েছে। হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ ও রেজিস্ট্রার যাচাই করে দেখা যায়, গত ৬ অক্টোবর রাতে তিনি এক যুবকের সঙ্গে একটি আবাসিক হোটেলে উঠেছিলেন। হোটেলের নথিতে তাঁকে স্ত্রী পরিচয়ে নিবন্ধন করা হয়। পরদিন সকালে তাঁরা হোটেল ত্যাগ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

হোটেলে অবস্থানকারী ওই যুবক সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে কয়েক মাস আগে তাজমিনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে তাজমিনের অনুরোধে তাঁকে কক্সবাজার আসার জন্য টাকা পাঠান এবং হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করেন। কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় ফেরার জন্য বাসের টিকিট ও যাতায়াতের খরচও দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে তাঁদের সম্পর্ক এবং তাজমিনের কক্সবাজারে আসার প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে তদন্ত চলছে।

গত ১০ অক্টোবর কুমিল্লা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়া হত্যাকাণ্ডের তদন্তের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন। পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধার করা আলামত, সিসিটিভি ফুটেজ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

এক কিশোরীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে কুমিল্লা ও কক্সবাজারে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব বিষয় স্পষ্ট হবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্টরা।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা