শনিবার | অক্টোবর ১৭, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ লামা শহর রক্ষা বাঁধ প্রকল্পে অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ

১০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের দায়সারা কাজ :

লামা শহর রক্ষা বাঁধ প্রকল্পে অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ

শাহাব উদ্দিন, লামা (বান্দরবার) প্রতিনিধি : বান্দরবানের লামা উপজেলায় পাহাড়ি ঢল ও মাতামুহুরী নদীর আকস্মিক ভাঙন থেকে পৌর শহরকে রক্ষা করতে” মাতামুহুরী নদী রক্ষা বাঁধ” বা লামা শহর রক্ষা বাঁধ প্রকল্পের কাজের মান অত্যন্ত নিন্মমানের হওয়ার ব্যাপক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

মাতামুহুরী নদীর ভাঙনপ্রবণ গতিপথ বিবেচনা করে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি মানদণ্ড বজায় রেখে এই বাঁধের নকশা প্রণয়ন করা হয়েছিল। নদী তীর সংরক্ষণ করতে মূলত মাতামুহুরী নদীর ডান তীরের ১.৫৫ কিলোমিটার (১৫৫০ মিটার) অতি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা জুড়ে স্থায়ী সংরক্ষণ কাজের নকশা করা হয় নকশাটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে এর মাধ্যমে লামা পৌর বাজার,আলীকদম-লামা সড়ক, আনসার ব্যাটালিয়ন সদর দফতর এবং নদীর তীরবর্তী কয়েক হাজার মানুষের বসতভিটা ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও ভাঙন থেকে স্থায়ী নিরাপত্তা দেওয়া যায়।

নদীর তীব্র স্রোত ও ভাঙন ঠেকাতে নদীর তীরে প্রতিরক্ষামূলক ঢাল তৈরি করে সারিবদ্ধভাবে সিসি ব্লক (কংক্রিট সিমেন্ট ব্লক) বসানোর মাধ্যমে প্রায় এক হাজার মিটার এলাকা জুড়ে নদীতে প্রায় দেড় লাখ সিসি ব্লক ডাম্পিং করে এই বাঁধ নির্মান করার নকশা প্রণয়ন করা হয়েছিল,তবে বাঁধটির কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হওয়ার আগেই ২০২৬ সালের জুনের দিকে একটি বড় ধরনের ধসের ঘটনা ঘটে, যা স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক তৈরি করে। কাজ শেষ হওয়ার পূর্বেই বাঁধের একটি বিশাল অংশের সিসি ব্লকগুলো সারিবদ্ধভাবে ধসে নিচের দিকে দেবে যায়। ব্লকগুলোর মাঝখানে দীর্ঘ ও গভীর ফাটল দেখা দেয় এবং নিচের মাটি সরে যাওয়ার কারণে পুরো ব্লক কাঠামোটি হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ছিল কাজের শুরু থেকেই নির্মাণ সামগ্রীর নিন্মমান এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে বাঁধটি টেকসই হয়নি এবং সামান্য জলের চাপেই ধসে পড়েছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের সর্বমোট প্রাক্কলিত বরাদ্দ প্রায় ১০০ কোটি টাকা (শত কোটি টাকা) তবে পুরো কাজটিকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্যাকেজ ও বিশেষায়িত অংশে ভাগ করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে প্রকল্পের বরাদ্দেরমূল স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ (প্যাকেজ-ভিত্তিক): নদীর তীব্র ভাঙন প্রবণ অংশগুলোতে সিসি ব্লক বসানোর জন্য প্রধান দুটি প্যাকেজে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে মূল নির্মাণকাজ শুরু হয়। বিশেষায়িত প্রতিরক্ষা প্রকল্প (লামা বাজার ও আনসার সদর দপ্তর অংশ): মাতামুহুরী নদীর ডান তীরে ১.৫৫ কিলোমিটার অংশ জুড়েই প্রতিরক্ষামূলক কাজের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে একটি বিশেষায়িত অংশ অনুমোদিত হয়। যার মোট বরাদ্দ ৪৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এখানে প্রতি মিটার নদী তীর রক্ষায় গড়ে প্রায় ২ লাখ ৯৫ হাজার টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।

জানা গেছে বাঁধের সিসি ব্লক ধসে যাওয়ার পর স্থানীয় সাংবাদিকরা যখন সাইটে গিয়ে কাজের মান ও ভাঙন নিয়ে প্রশ্ন করেন, তখন সেখানে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যানেজার কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এবং গণমাধ্যমকে এড়িয়ে যান।

লামা শহর রক্ষা বাঁধ (মাতামুহুরী নদী রক্ষা বাঁধ) প্রকল্পের কাজটির দায়িত্বে থাকা প্রধান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক নামটি স্থানীয় বা জাতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোতে প্রকাশ করা হয়নি।

বাঁধ ধসে যাওয়ার পর প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে ঠিকাদারি পক্ষের পরিচয় গোপন রাখার প্রবণতা দেখা গেছে ২০২৬ সালের জুনে বাঁধের সিসি ব্লক ধসে যাওয়ার পর স্থানীয় সংবাদকর্মীরা যখন মাঠপর্যায়ে তদন্ত করতে যান, তখন সেখানে দায়িত্বরত ঠিকাদার পক্ষের ম্যানেজার বা প্রতিনিধিরা কাজের মান নিয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি এবং তড়িঘড়ি করে স্থান ত্যাগ করেন,যৌথ তদারকি পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অধীনে থাকা শত কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্পগুলো সাধারণত বড় কোনো ঠিকাদারি গ্রুপ বা যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত হয়।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়া
লামা বাজারের শত শত ব্যবসায়ী এই প্রকল্পের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল, কারণ প্রতি বছর মাতামুহুরী নদীর বন্যায় তাদের কোটি কোটি টাকার মালামাল নষ্ট হয়।

বাঁধটি ধসে পড়ার পর বাজারের বড় বড় ব্যবসায়ী ও দোকানদারদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ব্যবসায়ীরা জানান, লামা পৌর বাজারটি এই নদীর খুব কাছে অবস্থিত। বাঁধের সিসি ব্লক দেবে যাওয়ায় পুরো বাজার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
লামা বাজার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন যে,লামা শহর রক্ষা বাঁধের (মাতামুহুরী নদী রক্ষা বাঁধ প্রকল্প) বর্তমান পরিস্থিতি চরম ঝুঁকিপূর্ণ এবং উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাঁধের তলদেশে পর্যাপ্ত বালি ও বেডিং উপাদান না দিয়ে তাড়াহুড়ো করে ব্লক বসিয়েছিল, যার কারণে পাহাড়ি ঢলের প্রথম ধাক্কাতেই সিসি ব্লকগুলো ধসে পড়েছে।

ভাঙন ঠেকাতে এবং লামা বাজারকে নদীগর্ভে বিলীন হওয়া থেকে বাঁচাতে দ্রুত উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং জরুরি ভিত্তিতে বাঁধটির টেকসই সংস্কার ও পুনঃনির্মাণের দাবি জানানো হচ্ছে।

লামা শহর রক্ষা বাঁধ প্রকল্পের অনিয়ম ও ধসের বিষয়ে বক্তব্য ও তথ্য প্রদান প্রসঙ্গে জনতে পানি উন্নয়ন বোর্ড বান্দরবানের দায়িত্বরত নির্বাহী প্রকৌশলী:অপু দেব এর অফিসিয়াল ইমেইলঃ xen.bandarban@bwdb.gov.bd তে মেইল করে তিন দিন অপেক্ষা করার পর কোন উত্তর না পাওয়াতে,অফিসিয়াল ফোন নাম্বার ০২৩৩৩৩০২০৩৩ এবং ০২৩৩৭৭১০০৭৯ এ একাধিক বার কল করার পরও কোন ধরনের উত্তর পাওয়া যায়নি।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা