শনিবার | অক্টোবর ১৭, ২০২৬
প্রচ্ছদ বাণিজ্য ঋণ পরিশোধেই রাজস্বের ১৪ শতাংশ, চাপে নিম্নআয়ের দেশ

ঋণ পরিশোধেই রাজস্বের ১৪ শতাংশ, চাপে নিম্নআয়ের দেশ

ব্যাংকক থেকে জাহাঙ্গীর খান বাবু : মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদের চাপে নিম্নআয়ের দেশগুলোর অর্থনীতি ক্রমেই কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়ছে। ঋণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে কিছু অগ্রগতি থাকলেও সুদের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এসব দেশের রাজস্ব আয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে ঋণ পরিশোধে। কয়েক বছর আগেও যেখানে রাজস্ব আয়ের ৮ শতাংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় হতো, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ শতাংশে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয়ের সক্ষমতা ধরে রাখা দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিম্নআয়ের দেশগুলোর ঋণ পুনর্গঠন দ্রুত ও কার্যকর করার পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণ এবং আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে শুধু ঋণ ব্যবস্থাপনা নয়, ন্যায্য রাজস্বনীতি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে (কিউএসএনসিসি) আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার ষষ্ঠ দিনে অনুষ্ঠিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এতে সৌদি আরবের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-জাদান উপস্থিত ছিলেন। ব্রিফিংটি সঞ্চালনা করেন আইএমএফের যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক জুলি কোজাক।

ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, দরিদ্র দেশগুলোর মানুষের জন্য মূল্যস্ফীতি একধরনের করের মতো কাজ করে। পণ্যমূল্য বাড়লে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, আর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তাদের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তোলে। এ পরিস্থিতিতে মানুষ সরকারের কাছ থেকে সুস্পষ্ট নীতি, স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থার নিশ্চয়তা প্রত্যাশা করে। একই সঙ্গে এমন পরিবেশ প্রয়োজন, যেখানে বেসরকারি খাত ও উদ্যোক্তারা সহজে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারবেন, বিনিয়োগ বাড়াতে পারবেন এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবেন।

আইএমএফের প্রধান বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনে নিম্নআয়ের দেশগুলো তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হওয়ায় মূল্যস্ফীতি, ঋণের উচ্চ ব্যয় কিংবা বৈদেশিক অর্থায়নের সংকট সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশগুলোর বাস্তব প্রয়োজন ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে নিম্নআয়ের দেশগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

ঋণ পরিশোধের চাপ বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জর্জিয়েভা বলেন, অনেক দেশ গত কয়েক বছরে নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করেছে এবং ঋণের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় ঋণের বোঝা কমানোর সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না। ঋণের পরিমাণ কমলেও উচ্চ সুদের কারণে সরকারকে রাজস্ব আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এবং জনগণের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, তথ্য-উপাত্তে উচ্চআয়ের দেশগুলোর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় ঋণের অনুপাত বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে নিম্নআয়ের দেশগুলোর ক্ষেত্রে এ অনুপাত কিছুটা কমছে। অর্থাৎ ঋণ ব্যবস্থাপনায় কিছু দেশ অগ্রগতি অর্জন করলেও ঋণ পরিশোধের ব্যয় ও অর্থায়নের শর্ত তাদের জন্য এখনও বড় সমস্যা। তাই শুধু ঋণের পরিমাণের দিকে নজর দিলেই হবে না; ঋণের সুদ, পরিশোধের সময়সীমা এবং সরকারের রাজস্ব আয়ের ওপর এর প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে।

নিম্নআয়ের দেশগুলোর জন্য আইএমএফের অর্থায়ন কার্যক্রম তুলে ধরে জর্জিয়েভা বলেন, এসব দেশের অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে সংস্থাটি কাজ করছে। সম্প্রতি দারিদ্র্য হ্রাস ও প্রবৃদ্ধি সহায়তা তহবিলের (পিআরজিটি) জন্য সদস্য দেশগুলোর কাছ থেকে অতিরিক্ত সহায়তা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ তহবিলের আওতায় যোগ্য দেশগুলোকে তুলনামূলক সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হয়। এর লক্ষ্য হলো, আর্থিক সংকটে থাকা দেশগুলো যেন অতিরিক্ত ঋণ ব্যয়ের চাপে না পড়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার সুযোগ পায়।

আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, নতুন সংস্কারের ফলে আগের তুলনায় সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার পরিমাণ তিন গুণেরও বেশি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনা, নীতিনির্ধারণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সক্ষমতা উন্নয়ন কার্যক্রমেও অতিরিক্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে ঋণ সহায়তার পাশাপাশি দেশগুলোর নিজস্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

তবে নিম্নআয়ের দেশগুলোকে সংকট মোকাবিলায় ব্যাপক ব্যয় সংকোচন কিংবা কঠোর অর্থনৈতিক সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে যেতেই হবে—এমন ধারণার সঙ্গে একমত নন জর্জিয়েভা। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক দেশ অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করা এবং ঋণের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি অর্জন করেছে। ফলে প্রতিটি দেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করে নীতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। নির্বিচারে সরকারি ব্যয় কমানোর পরিবর্তে কোন খাতে ব্যয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতিতে বেশি ভূমিকা রাখবে, তা নির্ধারণ করা জরুরি।

জর্জিয়েভা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ (এআই) নতুন প্রযুক্তির বিকাশ এবং সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন। প্রযুক্তির অগ্রগতি উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে প্রয়োজন উপযুক্ত নীতি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী যেন আরও পিছিয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করাও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে নিম্নআয়ের দেশগুলোর সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা এবং উন্নয়নের প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা। রাজস্ব আয়ের বড় অংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় হলে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ, জনসেবা সম্প্রসারণ ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অর্থ বরাদ্দের সুযোগ সীমিত হতে পারে। এ অবস্থায় ঋণ পুনর্গঠনের কার্যকর ব্যবস্থা, সহজ শর্তে অর্থায়ন, সুশৃঙ্খল রাজস্বনীতি এবং উন্নয়নমুখী সরকারি ব্যয় নিম্নআয়ের দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ব্যাংককের বার্ষিক সভায় আইএমএফের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, ঋণ সংকট মোকাবিলায় শুধু ঋণের পরিমাণ কমানো যথেষ্ট নয়; ঋণ পরিশোধের ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে রাখা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগ অক্ষুণ্ন রাখাও জরুরি। নিম্নআয়ের দেশগুলোকে স্থিতিশীল অর্থনীতির পথে এগিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক সহায়তার পাশাপাশি নিজস্ব নীতিগত সংস্কার, কার্যকর আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং সাধারণ মানুষের সুরক্ষার মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা